
ইবি রিপোর্ট
গল্পটা শুরু হয়েছিল ১৫ বছর আগে। ২০১১ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের গল্পটা দারুণভাবে শুরু করেছিলেন বিরাট কোহলি। সেই ম্যাচে অপরাজিত ১০০ রানের ইনিংস খেলেছিলেন ভারতের এই তারকা ব্যাটার। তখনই অনেকের মনে হয়েছিল, এই তরুণ একদিন বিশ্বকাপের ক্রিকেটে একের পর এক রেকর্ড গড়বেন।
সময় গড়িয়েছে। সেই ২২ বছরের তরুণ কোহলি এখন ৩৭ বছর ৩২৫ দিনের অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ক্রিকেটের বহু রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন তিনি। তবে সময়ের নিয়মে একদিন সবাইকেই প্রিয় খেলাটিকে বিদায় বলতে হয়। কোহলিও ধাপে ধাপে সেই বিদায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
২০২৪ সালের জুনে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন কোহলি। ভারত ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের পরই এই সংস্করণ থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। এরপর ২০২৫ সালের মে মাসে টেস্ট ক্রিকেট থেকেও অবসর নেন। এবার জানালেন, ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপই হবে তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ।
ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘জিওস্টার’-এর সঙ্গে আলাপকালে নিজের এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন কোহলি। আগামী বছর দক্ষিণ আফ্রিকা, নামিবিয়া ও জিম্বাবুয়েতে ৪ অক্টোবর থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বিদেশের মাটিতে ভিন্ন কন্ডিশনে অনুষ্ঠিতব্য এই বিশ্বকাপ শারীরিক ও মানসিকভাবে কঠিন হবে বলেও মনে করছেন কোহলি। তবে এই চ্যালেঞ্জই তাঁর জন্য বাড়তি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
কোহলি বলেন, ‘এবার খেলা হবে বিদেশের ভিন্ন কন্ডিশনে, যা শরীর এবং মনের ওপর বাড়তি চাপ ফেলে। তবে আমার জন্য এটিই ভারতের হয়ে শেষ বিশ্বকাপ। আর এটাই আমার মূল অনুপ্রেরণা—মাঠের লড়াইয়ে নিজের সবটুকু উজাড় করে দেওয়া।’
ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপেই শিরোপা জয়ের স্বাদ পেয়েছিলেন কোহলি। এরপর আরও তিনটি বিশ্বকাপে খেলেছেন তিনি। ২০২৩ সালের সর্বশেষ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ব্যাটিং করে ৭৬৫ রান করেছিলেন ভারতীয় এই ব্যাটার। এক বিশ্বকাপ আসরে সেটিই ছিল সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড।
ক্যারিয়ারের চারটি বিশ্বকাপের মধ্যে প্রথম ও সর্বশেষ আসরটি ঘরের মাঠে খেলেছেন কোহলি। ২০১১ সালে ভারতের বিশ্বকাপ জয়ের সময় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি। তবে ২০২৩ সালের আসরে ভারত ফাইনালে উঠলেও শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে শিরোপা জিততে পারেনি।
বর্তমানে ভারতের হয়ে শুধু ওয়ানডে ক্রিকেট খেলছেন ৩৭ বছর বয়সী কোহলি। আইপিএলের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতেও তিনি নিয়মিত খেলছেন। তাঁর কাছে ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ অন্য যেকোনো ক্রিকেট আসরের তুলনায় আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
বিশ্বকাপের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও তীব্রতা সম্পর্কে কোহলি বলেন, ‘৫০ ওভারের বিশ্বকাপের তীব্রতা অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে অনেক বেশি। কারণ, এখানে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সমপরিমাণ তীব্রতা নিয়ে প্রায় ১০ ম্যাচ খেলতে হয়। বাস্তবে দেখা যায়, এক দিনেই যেন আড়াইখানা টি-টোয়েন্টি ম্যাচের ধকল সইতে হয়। বিশ্বকাপের মতো এত বড় টুর্নামেন্টে টানা ১০টি ম্যাচজুড়ে একই পর্যায়ের তীব্রতা বজায় রাখা সত্যিই অনেক বড় বিষয়।’
ওয়ানডে বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ৩৭টি ম্যাচ খেলেছেন কোহলি। ৩৭ ইনিংসে ৫৯.৮৩ গড়ে তাঁর সংগ্রহ ১ হাজার ৭৯৫ রান। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচটি সেঞ্চুরি ও ১২টি ফিফটি।
বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রানের তালিকায় শচীন টেন্ডুলকারের পর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন কোহলি। বিশ্বকাপে টেন্ডুলকারের ২ হাজার ২৭৮ রানের রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে কোহলির প্রয়োজন আরও ৪৮৪ রান।
দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের ওয়ানডে দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে খেলছেন কোহলি। এবার সামনে তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। সেই আসরে ব্যক্তিগত লক্ষ্য কী—তা নিয়ে অবশ্য খুব বেশি রহস্য রাখেননি এই তারকা।
কোহলির কাছে শেষ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যও শিরোপা জয়। নিজের শেষ বিশ্বকাপে ভারতের হয়ে ট্রফি জিততে যা কিছু করা প্রয়োজন, তা করার প্রত্যয় জানিয়েছেন তিনি।
২০২৭ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে ভারতের ওয়ানডে প্রস্তুতিও শুরু হচ্ছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলবে ভারত। এরপর চলতি বছরের শেষ দিকে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে পাঁচটি ওয়ানডে এবং শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিনটি ওয়ানডে সিরিজ খেলার সূচি রয়েছে তাদের। ২০২৭ সালের শুরুতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও তিনটি ওয়ানডে ম্যাচ খেলবে ভারত।
এসব সিরিজের মধ্য দিয়েই ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নেবে ভারত। আর সেই প্রস্তুতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন বিরাট কোহলি। ২০১১ সালে মিরপুরে বাংলাদেশের বিপক্ষে অপরাজিত শতরান দিয়ে যে বিশ্বকাপযাত্রা শুরু করেছিলেন, ২০২৭ সালে সেই অধ্যায়ের শেষটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়—সেদিকেই থাকবে ক্রিকেটবিশ্বের নজর।
পাঠকের মন্তব্য