
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ফের হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা। বিভিন্ন গ্রামে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি ও গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বহু মানুষকে আহত করার অভিযোগ উঠেছে। হামলার সময় ইসরাইলি পুলিশ ও সেনাবাহিনীর নীরব ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
শুধু ফিলিস্তিনিরাই নয়, হামলায় আহতদের সহায়তায় এগিয়ে আসা অ্যাম্বুলেন্স এবং ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকরাও হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে পশ্চিম তীরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
নেতানিয়াহুর নিন্দা নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনা শুরু হলে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হামলার নিন্দা করেন। তিনি ঘটনাটিকে ‘কয়েকজন বিশৃঙ্খলাকারীর কাজ’ হিসেবে উল্লেখ করে হামলাকারীদের শাস্তির কথা বলেন।
তবে নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যের পরও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। হামলার বিভিন্ন ভিডিওতে মুখ ঢাকা ব্যক্তিদের দেখা গেলেও তাদের গ্রেপ্তারে ইসরাইলি পুলিশের দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যায়নি।
এ কারণে নেতানিয়াহুর নিন্দাকে অনেকেই বাস্তব পদক্ষেপের পরিবর্তে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন। সমালোচকদের মতে, হামলার দায় কয়েকজন ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দিলে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল ও বসতি সম্প্রসারণের বৃহত্তর নীতির বিষয়টি আড়ালে চলে যায়।
পশ্চিম তীরে বাড়ছে ইসরাইলি বসতি
দীর্ঘদিন ধরে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক দশকে এই অঞ্চলে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
১৯৯৩ সালে পশ্চিম তীরে প্রায় আড়াই লাখ ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী ছিল বলে উল্লেখ করা হলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা প্রায় সাত লাখে পৌঁছেছে। ইসরাইলি সরকার বিভিন্ন এলাকায় নতুন বসতি স্থাপনের অনুমোদন দেওয়ার পাশাপাশি সেখানে অবকাঠামো ও আবাসন নির্মাণে অর্থ ব্যয় করছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, এ ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বসবাসের জায়গা ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগ
ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনায় ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও হামলা ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে ঘরবাড়ি ও যানবাহনে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। হামলায় আহতদের চিকিৎসা ও উদ্ধারে বাধা সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও মানবিক সংকটে রূপ নেয়।
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা অব্যাহত থাকলে পশ্চিম তীরে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি বড় ধরনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা
ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা ও পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। চলতি বছরও ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে সমালোচকদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনেক দেশ হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করলেও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট কঠোর নয়।
ফলে শুধু বিবৃতি ও নিন্দার মধ্যেই আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ থাকছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর এর সুযোগে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখলের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা বন্ধ, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার জন্য ইসরাইলের ওপর কার্যকর চাপ তৈরির দাবি জানিয়ে আসছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।
পশ্চিম তীরের সাম্প্রতিক সহিংসতা তাই শুধু স্থানীয় নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি ফিলিস্তিনিদের অধিকার, ভূমি ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। হামলার ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পাঠকের মন্তব্য