
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বা পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের যে অতিরিক্ত ব্যয় হবে, তার অর্থ জোগাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নির্ধারিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নতুন পে স্কেলের কারণে বাড়তি যে অর্থ প্রয়োজন হবে, তা এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমেই জোগান দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এ নির্দেশনা দেন বলে বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে আদায় হওয়া ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকার তুলনায় নতুন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
পে স্কেলে বাড়তি ব্যয় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা
সরকার সোমবার সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে স্কেল ঘোষণা করেছে। নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে বছরে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
নতুন এই বেতন কাঠামোর মাধ্যমে প্রায় ২৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগী সরাসরি উপকৃত হবেন। তবে এর ফলে সরকারের ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এই বাড়তি ব্যয়ের অর্থের জোগান দিতে রাজস্ব আদায়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, উপদেষ্টা বৈঠকে যেকোনো মূল্যে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের উপায় খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন।
আরেক কর্মকর্তা জানান, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর ফলে যে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে, তা জোগানের দায়িত্ব এনবিআরকে দেওয়া হয়েছে।
ইতিহাসের সর্বোচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে চ্যালেঞ্জ
এনবিআরের জন্য চলতি অর্থবছরে নির্ধারিত ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
স্বাধীনতার পর দেশের ইতিহাসে রাজস্ব আদায়ে কোনো বছরই ২৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনের নজির নেই। সেখানে এবার আগের বছরের আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এমন উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্থনীতিতে বর্তমানে গতি কমে যাওয়া, শিল্প উৎপাদনে জ্বালানি সংকটের প্রভাব এবং আমদানি কমে যাওয়াকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন এনবিআর কর্মকর্তারা।
বিশেষ করে যেসব পণ্যের আমদানির মাধ্যমে বড় অঙ্কের শুল্ক ও কর আদায় হয়, সেসব পণ্যের আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ে চাপ তৈরি হয়েছে।
শুরুতেই ধীর রাজস্ব আদায়
নতুন অর্থবছর শুরুর পর থেকেই রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। সেপ্টেম্বর শুরু হলেও এনবিআর এখনো জুলাই মাসের রাজস্ব আদায়ের আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করেনি।
তবে একজন এনবিআর কর্মকর্তার দেওয়া সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, জুলাইয়ে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৯ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। আগের বছরের একই মাসে ভ্যাট আদায়ের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা।
অন্যদিকে আগস্টে ভ্যাট আদায় আরও কমে ৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। আগের বছরের আগস্টে ভ্যাট আদায় হয়েছিল ১১ হাজার ৮১ কোটি টাকা।
অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই ভ্যাট আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আমদানি শুল্ক ও কর আদায়ও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কম হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে এর সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এখনো পাওয়া যায়নি।
অর্থনীতির দুর্বলতায় রাজস্ব আদায়ে চাপ
এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য খুব একটা অনুকূল নয়। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি আমদানি কমে যাওয়ায় আমদানি পর্যায়ে শুল্ক ও কর আদায়ের সুযোগও সংকুচিত হয়েছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি কমে গেলে ভ্যাট ও আয়কর আদায়েও তার প্রভাব পড়ে। ফলে একদিকে সরকারের ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে রাজস্ব আয়ের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হয়ে উঠছে।
লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সংশয়
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এনবিআরের ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাভিলাষী বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো ফাহমিদা খাতুনের মতে, এনবিআরের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা—দুই দিক থেকেই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন।
তিনি মনে করেন, এনবিআরের সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে এবং সংস্থাটিতে এখনো অর্থবহ সংস্কারের ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়ানো এবং করের আওতা সম্প্রসারণেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।
তার মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং শিল্প খাতের সংকোচনের সঙ্গে নতুন করে জ্বালানি সংকট যুক্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি আমদানিও কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি দুর্বল থাকায় ভ্যাট ও কর আদায় দ্রুত বাড়ানো কঠিন।
পে স্কেলের অর্থ জোগানই বড় পরীক্ষা
নতুন পে স্কেল সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আর্থিক স্বস্তি আনলেও এর বাড়তি ব্যয় সরকারের জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করবে। বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার ব্যয় মেটাতে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ওপর সরকার যে গুরুত্ব দিচ্ছে, এনবিআরের সঙ্গে বৈঠকের নির্দেশনায় সেটিই স্পষ্ট হয়েছে।
তবে অর্থনীতির গতি মন্থর থাকা এবং রাজস্ব আদায়ের বর্তমান প্রবণতার মধ্যে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা এনবিআরের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন করের আওতা বাড়ানো, রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ এবং আদায় ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোই সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাঠকের মন্তব্য