
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রতিশ্রুতি ও সমঝোতার শর্ত মেনে চললেই কেবল তেহরান-ওয়াশিংটনের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বাস্তবায়ন করবে ইরান। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের হুমকি এলে তার জবাব দৃঢ় ও অনিবার্য হবে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইরানি প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যেকোনো সমঝোতা পারস্পরিকতা এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে হতে হবে।
পেজেশকিয়ান বলেন, ‘পারস্পরিক সমঝোতা একতরফা বিষয় নয়। মার্কিন পক্ষ যদি চুক্তি মেনে চলে, আমরাও আমাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করব।’
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অযৌক্তিক বক্তব্য’ এবং ‘ভিত্তিহীন হুমকি’র ক্ষেত্রে তেহরানের অবস্থান হবে যুক্তিসংগত সতর্কতা ও মানবিক মর্যাদার প্রতি সম্মানের ভিত্তিতে। তবে প্রয়োজন হলে ইরান দৃঢ় ও নির্ভীকভাবে আত্মরক্ষা করবে।
যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা
ইরানি প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
গত ১৮ জুন ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ওই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সামরিক সংঘাতের অবসান এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ফ্রন্টে উত্তেজনা কমানোর জন্য একটি কাঠামো তৈরি হয়।
সমঝোতার আওতায় হরমুজ প্রণালির সামুদ্রিক নিরাপত্তা, ইরানের তেল রপ্তানি এবং জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এ ছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ আরও বিস্তৃত বিষয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনা প্রাথমিক ধারাগুলো বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পাল্টাপাল্টি হামলায় চাপে কূটনীতি
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার মধ্যেই নতুন করে কয়েক দিনের সামরিক সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে দুই দফা হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরান যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করেছিল। এর পাল্টা জবাব হিসেবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) রোববার কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন হামলার নিন্দা জানিয়ে একে সমঝোতার ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার রাতে সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন অব্যাহত রাখলে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সামরিকভাবে কাজটি সম্পূর্ণ করতে’ হতে পারে।
তবে রোববার ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, হরমুজ প্রণালির কাছে পাল্টাপাল্টি হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আপাতত সংঘাত থেকে সরে দাঁড়াবে।
দোহা বৈঠক ঘিরে অনিশ্চয়তা
এদিকে, পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পরবর্তী আলোচনার জন্য দুই দেশ মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় বৈঠকে বসতে সম্মত হয়েছে।
তবে বৈঠকের গুরুত্ব নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেছেন। সোমবার দোহা বৈঠক সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বৈঠকটি ‘হয়তো গুরুত্বপূর্ণ, হয়তো নয়’।
অন্যদিকে, ইরানি কর্মকর্তারা ধারাবাহিকভাবে বলে আসছেন, দ্বিপক্ষীয় সমঝোতায় অগ্রগতি সম্ভব হবে কেবল তখনই, যখন উভয় পক্ষ নিজেদের প্রতিশ্রুতি পালন করবে এবং একতরফা পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে।
পারস্পরিক প্রতিশ্রুতির ওপর জোর ইরানের
পেজেশকিয়ানের সর্বশেষ বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের পথ পুরোপুরি বন্ধ করতে চায় না। তবে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, যে কোনো সমঝোতা বাস্তবায়নে দুই পক্ষের সমান দায়িত্ব পালন এবং পারস্পরিক আস্থা বজায় রাখা জরুরি।
ইরানি কর্মকর্তাদের অবস্থান হলো, কোনো সমঝোতা একতরফাভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির শর্ত ও নিজেদের প্রতিশ্রুতি মেনে চললে ইরানও তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে।
একই সঙ্গে তেহরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সামরিক হুমকি বা হামলা হলে ইরান প্রয়োজন অনুযায়ী আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করবে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার মাধ্যমে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা কমানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলায় তা আবারও বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। এখন দুই দেশের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং দোহা বৈঠক এ কূটনৈতিক প্রক্রিয়া কোন দিকে এগোয়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাঠকের মন্তব্য