
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পানি বণ্টন চুক্তি স্থগিত করলেও এর আওতাভুক্ত শর্তগুলো ভারতকে মেনে চলতে হবে বলে নির্দেশ দিয়েছেন নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন (স্থায়ী সালিশি আদালত)। একই সঙ্গে কাশ্মীর অঞ্চলে নির্মাণাধীন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর কাজও সিন্ধু পানি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সীমিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) দেওয়া এই সিদ্ধান্তে আদালত বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলেও ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো কার্যকর রয়েছে। ফলে ভারত একতরফাভাবে চুক্তি স্থগিত করলেও এর আওতায় থাকা পানি বণ্টন ও নদী ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা থেকে সরে যেতে পারবে না।
তবে আদালতের এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত। নয়াদিল্লির দাবি, তথাকথিত এই সালিশি আদালত গঠনেরই কোনো বৈধ এখতিয়ার নেই। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আদালতের সিদ্ধান্তকে ‘অবৈধ’ এবং ‘তথাকথিত’ বলে উল্লেখ করে জানিয়েছে, তারা এই রায় মানবে না।
কাশ্মীর হামলার পর চুক্তি স্থগিত
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর থাকা সিন্ধু পানি চুক্তি নতুন করে বড় ধরনের বিরোধের কেন্দ্রে আসে গত বছরের এপ্রিল মাসে। কাশ্মীরের একটি পর্যটনকেন্দ্রে হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর নয়াদিল্লি পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তিটি স্থগিত করার ঘোষণা দেয়।
ওই হামলায় জড়িত তিন হামলাকারীর মধ্যে দুজনকে পাকিস্তানি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করার দাবি করে ভারত। হামলার পরপরই পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একাধিক কঠোর পদক্ষেপ নেয় নয়াদিল্লি। এরই অংশ হিসেবে ১৯৬০ সাল থেকে কার্যকর থাকা সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে পাকিস্তান ওই হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে। চুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েও ইসলামাবাদ আপত্তি জানায় এবং বিষয়টি নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেয়।
পাকিস্তানের কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ সিন্ধুর পানি
সিন্ধু পানি চুক্তি পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক পানি চুক্তি। দেশটির কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন অনেকাংশে সিন্ধু নদী ও এর সঙ্গে যুক্ত নদীগুলোর পানির ওপর নির্ভরশীল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষিজমিতে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই নদী ব্যবস্থার ভূমিকা রয়েছে। ফলে ভারত চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা দেওয়ার পর পাকিস্তানের মধ্যে পানি সরবরাহ ও কৃষি খাত নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত চুক্তিটির অধীনে দুই দেশের মধ্যে সিন্ধু নদী অববাহিকার পানি ব্যবহারের বিষয়ে একটি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়।
তিনটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে একাধিক সামরিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যেও এত বছর দুই দেশ এই চুক্তি কার্যকর রেখেছিল। ফলে চুক্তিটি ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়েও বিরোধ
সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি কাশ্মীর অঞ্চলে ভারতের নির্মাণাধীন দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়েও দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ রয়েছে।
পাকিস্তানের অভিযোগ, এসব প্রকল্পে জলাধারের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর কাজ করা হচ্ছে, যা সিন্ধু পানি চুক্তির নির্ধারিত সীমার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। গত বছর ভারত দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে জলাধারের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর কাজ শুরু করলে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
ইসলামাবাদ ভারতের এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয়, পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প পরিচালনার ক্ষেত্রে চুক্তির নির্ধারিত শর্ত মেনে চলা জরুরি।
ভারতের নেওয়া এই উদ্যোগকে ১৯৬০ সালের চুক্তির আওতার বাইরে গিয়ে প্রকল্প পরিচালনার ক্ষেত্রে দেশটির প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
স্থায়ী সালিশি আদালত তার সিদ্ধান্তে জানিয়েছে, সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো পুরোপুরি কার্যকর রয়েছে। চুক্তি স্থগিত বা বাতিল করার ক্ষেত্রে ভারতের দেওয়া কারণকে যথেষ্ট বা যৌক্তিক বলে মনে করেনি আদালত।
আদালতের মতে, দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বা অন্য কোনো বিরোধ তৈরি হলেও চুক্তির অধীনে থাকা বাধ্যবাধকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না।
বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর ওপর ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নকশা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে চুক্তির নির্ধারিত শর্তগুলো মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আদালত।
আদালত বলেছে, পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর ওপর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নকশা ও পরিচালনাসহ চুক্তির আওতাধীন সব ধরনের বাধ্যবাধকতা ভারতকে মেনে চলতে হবে।
নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
এদিকে, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর নির্মাণকাজ সিন্ধু পানি চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নির্ধারণের জন্য বিশ্বব্যাংকের নিয়োগ করা একজন নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের ভূমিকার কথাও জানিয়েছে আদালত।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ওই বিশেষজ্ঞ ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে হিমালয় অঞ্চলে ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর নির্মাণকাজ চুক্তির বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।
পাকিস্তানের দাবির সঙ্গে একমত হয়ে আদালত আরও জানিয়েছে, ওই নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের সিদ্ধান্ত দেওয়ার পরবর্তী ৯০ দিন পর্যন্ত রাটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধের দেয়াল ও পানি প্রবেশের কাঠামো নির্ধারিত উচ্চতার বেশি নির্মাণ করা যাবে না।
এর ফলে কাশ্মীরে ভারতের চলমান জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর নির্মাণ ও নকশা নিয়ে নতুন করে আইনি ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে।
ভারতের কঠোর প্রত্যাখ্যান
আদালতের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরপরই এর বিরোধিতা করেছে ভারত। নয়াদিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, এই সালিশি আদালত গঠনই সিন্ধু পানি চুক্তির ‘গুরুতর লঙ্ঘন’।
ভারতের দাবি, বিশ্বব্যাংক চুক্তির শর্ত স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করে তথাকথিত এই আদালত গঠন করেছে। তাই আদালতের দেওয়া সিদ্ধান্তও ভারত গ্রহণ করছে না।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, ভারত এই সালিশি সংস্থার আইনগত অস্তিত্ব কখনো স্বীকার করেনি। দেশটির অবস্থান হলো, সংস্থাটি অবৈধভাবে গঠিত এবং এর সামনে হাজির হওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা ভারতের নেই।
বিবৃতিতে ভারত আরও বলেছে, তারা কখনো এই সংস্থার সামনে হাজির হয়নি এবং এর আগে দেওয়া কোনো সিদ্ধান্তকেও আমলে নেয়নি।
সামনে আরও বাড়তে পারে উত্তেজনা
সিন্ধু পানি চুক্তি ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য থাকলেও এতদিন চুক্তিটি সামগ্রিকভাবে কার্যকর ছিল।
তবে কাশ্মীরের সাম্প্রতিক হামলা, চুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্ত এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে বিরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। স্থায়ী সালিশি আদালতের নতুন সিদ্ধান্ত একদিকে পাকিস্তানের আইনি অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে, অন্যদিকে ভারত এর বৈধতাই অস্বীকার করেছে।
ফলে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকাজ এবং সিন্ধু নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের বিরোধ আগামী দিনগুলোতে আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ২০২৭ সালের মধ্যে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের সিদ্ধান্ত এবং তার পরবর্তী কার্যক্রম এই বিরোধের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
পাঠকের মন্তব্য