
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত বা চাকরি থেকে অপসারণের মতো গুরুতর শাস্তি দিতে হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের ‘আপিল ও সালিশ কমিটি’র মাধ্যমে বিষয়টি পরীক্ষা করা এবং বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আদালত স্পষ্ট করে বলেছেন, শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদনের আগে কোনো বেসরকারি কলেজের গভর্নিং বডি শিক্ষককে বরখাস্ত বা চাকরি থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারে না। একই সঙ্গে কোনো শিক্ষককে আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ না দিয়ে কিংবা নিয়মবহির্ভূতভাবে তদন্ত করে বরখাস্ত করাও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও বেআইনি।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) মোহা. আখতারুজ্জামান বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিস্তারিত বিষয় সামনে আসে। এর আগে অসদাচরণের অভিযোগে এক কলেজ শিক্ষকের বরখাস্তের সিদ্ধান্তে শিক্ষা বোর্ডের অনাপত্তিকে চ্যালেঞ্জ করে করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে এই রায় দেন আদালত।
গত ৭ জুলাই বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী এবং বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ রায় দেন। রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবির।
বরখাস্তের আগে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের নির্দেশ
রায়ে আদালত বলেন, বেসরকারি কলেজের কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত বা অপসারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রবিধানমালা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের নীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।
কোনো শিক্ষককে কারণ দর্শানোর যথাযথ সুযোগ না দিয়ে কিংবা কেবল মৌখিক বা মোবাইল ফোনে দেওয়া নির্দেশের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুততার সঙ্গে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত হিসেবে গণ্য হবে বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত।
হাইকোর্ট আরও বলেন, আপিল ও সালিশ কমিটির পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং শিক্ষা বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়া কোনো শিক্ষককে সরাসরি বরখাস্ত বা অপসারণের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা যায় না।
গচিহাটা কলেজের শিক্ষককে ঘিরে মামলা
মামলাটি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আবুল মনসুরকে বরখাস্তের ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর গচিহাটা পল্লি একাডেমির প্রধান শিক্ষিকা জাকিয়া বেগম শিক্ষক আবুল মনসুরের বিরুদ্ধে অনৈতিক বা অসদাচরণের অভিযোগ করেন।
অভিযোগে বলা হয়, ওই দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আবুল মনসুর জাকিয়া বেগমের বাড়িতে যান। প্রথমে তার মেয়েকে একটি বই ফেরত দেওয়ার কথা বলে সেখানে গেলেও পরে অসৎ উদ্দেশ্যে আবার ফিরে এসে তার ছোট মেয়ের পাশে বসেন এবং তার মাথা ও হাতে স্পর্শ করেন বলে অভিযোগ করা হয়। এ ছাড়া তৃতীয়বারও বাড়িতে প্রবেশের চেষ্টা করার অভিযোগ আনা হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে কলেজের অধ্যক্ষ ১৭ নভেম্বর শিক্ষক আবুল মনসুরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, ওই নোটিশে অভিযোগের তারিখ হিসেবে ৭ নভেম্বর উল্লেখ করা হয়েছিল এবং তিন দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়।
পরদিন দেওয়া জবাবে শিক্ষক বাড়িতে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে তার বিরুদ্ধে আনা কোনো অসৎ উদ্দেশ্য বা অনৈতিক আচরণের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
শিক্ষকের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় গভর্নিং বডি ২৯ নভেম্বর পাঁচটি নির্দিষ্ট প্রশ্নসংবলিত দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ৬ ডিসেম্বর দেওয়া জবাবেও শিক্ষক তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
মৌখিক নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন
এরপর গভর্নিং বডির সভাপতি ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা মোহা. আখতারুজ্জামানের মৌখিক বা মোবাইল ফোনের নির্দেশে ৭ ডিসেম্বর অধ্যক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ওই তদন্ত কমিটি নিয়মবহির্ভূতভাবে মাত্র ছয় দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি গভর্নিং বডির সভায় শিক্ষক মো. আবুল মনসুরকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরদিন অর্থাৎ ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর দেখানো হয়।
তবে গভর্নিং বডির এই সিদ্ধান্ত পরবর্তী অনুমোদনের জন্য ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটির কাছে পাঠানো হয়।
বোর্ডের কমিটি বরখাস্তের সিদ্ধান্ত বাতিল করে
২০১৫ সালের ২০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সভায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটি গভর্নিং বডির বরখাস্তের প্রস্তাব নামঞ্জুর করে।
একই সঙ্গে শিক্ষক মো. আবুল মনসুরকে সব বকেয়া বেতন-ভাতাসহ পদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেয় কমিটি।
২৮ মে একটি মেমোর মাধ্যমে কলেজ কর্তৃপক্ষকে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। পরবর্তী সময়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আবেদন করলেও শিক্ষা বোর্ড জানায়, আপিল ও সালিশ কমিটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার কোনো আইনগত বিধান নেই।
এরপর বোর্ডের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও গভর্নিং বডির সভাপতি মোহা. আখতারুজ্জামান। রিটের পর আদালত রুল জারি করেন এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর স্থগিতাদেশ দেন।
বকেয়া বেতন-ভাতা ও পেনশন দিতে নির্দেশ
মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত ৭ জুলাই হাইকোর্ট রুল খারিজ করে দেন এবং আগের দেওয়া স্থগিতাদেশও বাতিল করেন।
তবে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক অবসরের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছে যাওয়ায় তাকে আগের পদে পুনর্বহাল করার আর সুযোগ নেই বলে রায়ে উল্লেখ করেন আদালত।
এ কারণে পুনর্বহালের পরিবর্তে বরখাস্তের তারিখ থেকে অবসরের তারিখ পর্যন্ত তার প্রাপ্য সব বকেয়া বেতন-ভাতা, চাকরিসংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা এবং প্রযোজ্য পেনশন সুবিধা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আদালত বলেন, বিচারাধীন অবস্থায় শিক্ষক মো. আবুল মনসুর অবসরের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছে গেছেন। ফলে তাকে বর্তমানে পূর্বের পদে পুনর্বহাল করার সুযোগ নেই। তবে বরখাস্তের তারিখ থেকে অবসর গ্রহণের তারিখ পর্যন্ত তিনি তার প্রাপ্য সব বেতন-ভাতা, চাকরিজনিত সুযোগ-সুবিধা এবং পেনশনের পাওনা পাওয়ার পূর্ণ অধিকারী।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
হাইকোর্টের এই রায়ে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে গুরুতর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গভর্নিং বডি নিজস্ব সিদ্ধান্তে কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত বা অপসারণ করলেও তা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটির পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের মাধ্যমে কার্যকর হতে হবে।
বোর্ডের অনুমোদনের আগে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত কার্যকর করলে তা আইনগতভাবে টেকসই হবে না। একই সঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষককে আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া এবং বিধিমালা অনুযায়ী তদন্ত সম্পন্ন করাও বাধ্যতামূলক।
রায়ে শিক্ষা বোর্ড ও কলেজ কর্তৃপক্ষকে হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য