
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ও বরফ-পাথরের ধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ১৪৩ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নেপাল ও প্রতিবেশী ভারত থেকে ১ হাজার ১২৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। চীনের তিব্বত অংশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে আরও ১৬টি মরদেহ।
বিবিসি ও দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার ভোর ৫টা পর্যন্ত বন্যার উৎপত্তিস্থল রাসুয়া জেলা থেকে ৪৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া নুওয়াকোটে ১৫৫, ধাদিংয়ে ৫৯, চিতওয়ানে ৩৪৮, গোরখায় ৬৬, তানাহুনে ৩৮, নওয়ালপরাসি ইস্টে ২১৭ এবং নওয়ালপরাসি ওয়েস্টে ১৯০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ভারতে পাওয়া গেছে আরও ৯টি মরদেহ।
এদিকে নেপাল ও চীন মিলিয়ে এখনো ৫ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এর মধ্যে নেপালে নিখোঁজের সংখ্যা ৪ হাজার ৮৫৮ এবং চীনে ৫৪৬ জন।
শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ১১৩ মরদেহ
নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার করা ১ হাজার ১১৩টি মরদেহের ময়নাতদন্ত ও আইনগত পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ৯৫টি মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সহায়তার জন্য ৯১১টি অজ্ঞাত মরদেহের তথ্য নেপাল পুলিশের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। ডিএনএ ও অন্যান্য শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপালজুড়ে ব্যাপক উদ্ধার তৎপরতা চলছে। দুর্গত এলাকায় উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং উদ্ধার করা মরদেহ ব্যবস্থাপনার জন্য ৭ হাজার ৯১২ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৫৪১ জনকে দুর্গত এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে আটকা শত শত মানুষ
হিমবাহ, বরফ ও পাথরের ধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ভোতেকোশি নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কয়েকটি জেলার জনবসতি, সড়ক, সীমান্ত বাণিজ্য অবকাঠামো এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিধ্বস্ত কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে এখনো অন্তত ৬৩৯ জন আটকা রয়েছেন। ফলে এসব স্থাপনা উদ্ধার অভিযানের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো থেকে এখন পর্যন্ত ২৭৯ শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়েছে। আটকে থাকা অন্যদের উদ্ধারে নেপাল, ভারত ও চীনের উদ্ধারকারী দলগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
নেপালের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, উদ্ধারকারীরা বিভিন্ন টানেলের প্রবেশমুখ থেকে পানি সরানোর চেষ্টা করছেন। কোথাও কোথাও রক ব্রেকার ব্যবহার করে ভেতরে প্রবেশের পথ তৈরি করা হচ্ছে। তবে কয়েকটি টানেলে এখনো সরাসরি প্রবেশ করা সম্ভব হচ্ছে না।
টানেলে প্রায় ৫০০ মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কা
রাসুয়া জেলার হাকু গ্রাম থেকে উদ্ধারকাজে সহায়তা করা পর্বত গাইড আশিষ গুরুং রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি টানেলে মানুষের পক্ষে সরাসরি প্রবেশ করা সম্ভব হচ্ছে না। সেখানে বুলডোজার ও খননযন্ত্রের মতো ভারী সরঞ্জাম প্রয়োজন।
তিনি জানান, ঘটনাস্থলে থাকা দুটি ভারী যন্ত্রের একটি অচল হয়ে গেছে এবং অন্যটি মেরামত করা হচ্ছে। ওই টানেলের ভেতরে প্রায় ৫০০ মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফলে সময় যত গড়াচ্ছে, উদ্ধারকারীদের ওপর চাপও বাড়ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ধ্বংসস্তূপ এবং ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে নানা ধরনের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।
সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা
উদ্ধার অভিযানে ৯ হাজার ২০০-এর বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আহতদের উদ্ধার, নিখোঁজদের অনুসন্ধান, মরদেহ ব্যবস্থাপনা, বন্ধ সড়ক খুলে দেওয়া এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে তারা কাজ করছেন।
প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর অন্যতম নুওয়াকোটে সড়ক যোগাযোগ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। এতে দুর্গত এলাকায় উদ্ধারকারী দল পৌঁছানো এবং ত্রাণসামগ্রী সরবরাহের কাজ সহজ হয়েছে।
কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থাও ধীরে ধীরে পুনঃস্থাপন করা হচ্ছে। তবে দুর্গম ও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে আরও সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চীনের তিব্বত অংশেও উদ্ধার অভিযান
নেপালের পাশাপাশি চীনের তিব্বত সীমান্ত এলাকাতেও উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চলছে। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে সেখানে উদ্ধারকারীদের কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে।
খাড়া পাহাড়ি গিরিখাতের এক পাশে অস্থিতিশীল পর্বত ঢাল এবং অন্য পাশে প্রবল স্রোতের নদী—এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেই উদ্ধারকারীরা রাতভর কাজ করছেন। নেপাল সীমান্তের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
চীন জানিয়েছে, দুর্গত এলাকায় ডিএনএ পরীক্ষার বিশেষজ্ঞ পাঠানো হবে। নিখোঁজ ও অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তের কাজে এসব বিশেষজ্ঞ সহায়তা করবেন।
এ ছাড়া চীনের পক্ষ থেকে দ্বিতীয় দফায় ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। এসব ত্রাণের মধ্যে ড্রোন এবং পানি বিশুদ্ধকরণ সরঞ্জামও রয়েছে।
বাড়ছে দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগের আশঙ্কা
ভয়াবহ এই বন্যায় তাৎক্ষণিক প্রাণহানির পাশাপাশি নেপালের অবকাঠামো, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সীমান্ত যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। হাজারো মানুষ নিখোঁজ থাকায় উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
হিমবাহ ও পাহাড়ি ঢাল থেকে নেমে আসা বরফ, পাথর ও পানির প্রবল স্রোত দুর্গম অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।
বর্তমানে নেপাল, ভারত ও চীনের উদ্ধারকারী দলগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। নিখোঁজদের সন্ধান, আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান অগ্রাধিকার।
#entrepreneurbd #NepalFlood #Nepal #নেপাল #হিমবাহধস #নেপালবন্যা #বন্যায়মৃত্যু #উদ্ধারঅভিযান
পাঠকের মন্তব্য