
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ও অন্যান্য যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে ব্যবহারের জন্য ইরানকে সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে গোপনে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার দেওয়া প্রযুক্তিগত সহায়তার মূল লক্ষ্য ইরানকে ‘র্যামজেট প্রপালশন সিস্টেম’ তৈরিতে সক্ষম করে তোলা। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রকে শব্দের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি গতিতে উড্ডয়ন করানো সম্ভব।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, রাশিয়ার কাছ থেকে এ ধরনের সংবেদনশীল সামরিক প্রযুক্তি ইরানের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত দেশটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সর্বোচ্চ অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয়। ফলে এ সহযোগিতার পেছনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অনুমোদন থাকার সম্ভাবনার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৩ সালে শুরু গোপন প্রকল্প
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সি-৩৪০এল’ কোড নামের একটি গোপন সামরিক প্রকল্প ২০২৩ সালে শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের সময়ও প্রকল্পটির কার্যক্রম অব্যাহত ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এই প্রকল্পের আওতায় ইরানকে র্যামজেট প্রযুক্তি উন্নয়নে সহযোগিতা দেওয়া হয়। ইরান ইতোমধ্যে এ ধরনের ইঞ্জিনের পরীক্ষা চালিয়েছে বলে জানা গেলেও, সেটি সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তার নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সিআইএর সাবেক সামরিক বিশ্লেষক জিম ল্যামসনের মতে, এই প্রযুক্তি ইরানের জন্য একটি নতুন কৌশলগত অস্ত্র ব্যবস্থা তৈরির সুযোগ করে দিতে পারে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলো নতুন ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
কেন সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে এত উদ্বেগ?
সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর উচ্চ গতি। এসব ক্ষেপণাস্ত্র তুলনামূলকভাবে নিচু দিয়ে উড়তে পারে এবং দ্রুত গতির কারণে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এগুলো শনাক্ত ও প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ঘণ্টায় প্রায় ২ হাজার ২০০ মাইল পর্যন্ত গতিতে ছুটতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি দিয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার কারণে প্রতিপক্ষের রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়ার সময়ও কমে যায়।
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফ্যাবিয়ান হিনৎস বলেছেন, রাশিয়ার কাছ থেকে পাওয়া এই প্রযুক্তি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের প্রযুক্তি অর্জনের চেষ্টা করে আসছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রুশ অস্ত্র কোম্পানির সম্পৃক্ততার দাবি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রোসোবোরনএক্সপোর্ট প্রকল্পটির সমন্বয় করেছে। এ কাজে রাশিয়ার রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনপিও মাশিনোস্ট্রয়েনিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ২০১৪ সাল থেকেই এনপিও মাশিনোস্ট্রয়েনিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ইরানের কাছ থেকে র্যামজেট ইঞ্জিন-সংক্রান্ত একটি প্রযুক্তিগত নথি পায়।
এরপর রুশ প্রকৌশলীরা ইরানের পরীক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। ওই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ক্ষেপণাস্ত্রটির কার্যকারিতা নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন এবং সম্ভাব্য সমাধান ইরানের কাছে পাঠানো হয়।
প্রকল্পটিতে রাশিয়ার এনপিও মাশিনোস্ট্রয়েনিয়ার জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ ক্ষেপণাস্ত্র প্রকৌশলীদের কয়েকজন যুক্ত ছিলেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এমনকি ২০২৩ সালে প্রকল্পের চুক্তি স্বাক্ষরের আগে কয়েকজন প্রকৌশলী ইরান সফর করেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরান-রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতা বাড়ছে
রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সামরিক সহযোগিতার বিষয়টি নতুন নয়। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যবহারের জন্য ইরান বিপুলসংখ্যক শাহেদ ড্রোন সরবরাহ করেছে। এর বিনিময়ে রাশিয়া ইরানকে সামরিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে বলে পশ্চিমা বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ রয়েছে।
প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিকোল গ্রাজেস্কির মতে, দুই দেশের এই সহযোগিতা কেবল দ্বিপাক্ষিক সামরিক সম্পর্কের বিষয় নয়; এর সঙ্গে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক হিসাবও জড়িত থাকতে পারে।
তাঁর মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যেও যুক্তরাষ্ট্রকে চাপের মধ্যে রাখতে রাশিয়া ইরানকে সহযোগিতা করছে। এতে একাধিক রণক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে।
পুতিনের সহযোগিতার আশ্বাস
এর মধ্যেই গত মঙ্গলবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে মস্কোর সহযোগিতার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন।
পুতিন বলেন, কঠিন সময়ে ইরানের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে রাশিয়া প্রস্তুত রয়েছে এবং চলমান সংকটে প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখবে।
এদিকে এক মাসের বিরতির পর গত সপ্তাহান্ত থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত আবারও তীব্র হয়েছে। হরমুজ প্রণালী ঘিরে সামরিক উত্তেজনাও বেড়েছে। মার্কিন বাহিনী লারাক দ্বীপে ইরানের দুটি রকেট লঞ্চার ধ্বংস করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জবাবে ইরানও মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়ার কাছ থেকে ইরানের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি পাওয়ার খবর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন সামরিক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তবে প্রতিবেদনে উল্লিখিত প্রযুক্তি ইরান সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
#entrepreneurbd #Russia #Iran #রাশিয়া #ইরান #সুপারসনিকক্ষেপণাস্ত্র #মধ্যপ্রাচ্য
পাঠকের মন্তব্য