
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট সিরিজ নিয়ে নতুন করে আশার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি তামিম ইকবাল। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ভারতের বিপক্ষে তিনটি ওয়ানডে ও তিনটি টি-টোয়েন্টি খেলার কথা ছিল বাংলাদেশের। তবে নির্ধারিত সময়ে সিরিজটি আয়োজন করা সম্ভব হচ্ছে না।
দুই দেশের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে সিরিজটি পুরোপুরি বাতিল হয়ে যেতে পারে—এমন আলোচনা থাকলেও বিসিবি সভাপতি জানিয়েছেন, এখনো এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং নতুন একটি সময় বের করে সিরিজটি আয়োজনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ড।
‘দুই বোর্ডই চাইছে সিরিজটি হোক’
জনপ্রিয় ক্রীড়া প্ল্যাটফর্ম ‘নট আউট নোমান’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তামিম ইকবাল বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডই সিরিজটি আয়োজনের ব্যাপারে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো দুই দলের ব্যস্ত সূচির মধ্য থেকে উপযুক্ত সময় বের করা।
তামিম বলেন, ‘এটা (ভারত সিরিজ) হবে না—এমন সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি। একটা তথ্য দিই, দুই বোর্ডই চাইছে এটা হোক। বিসিসিআই ও বিসিবি দুই পক্ষই খুব আন্তরিক। আমরা সময়ের সুযোগ খুঁজছি, কখন এটা করা যায়, কোন সময়ে সম্ভব—সেটা নিয়ে আলোচনা করছি।’
অর্থাৎ নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও সিরিজ আয়োজনের সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে আলোচনা চলছে।
ব্যস্ত সূচির কারণে সময় বের করা কঠিন
তামিম জানান, বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দলেরই সামনে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সূচি রয়েছে। ফলে নতুন করে ছয়টি ম্যাচ আয়োজনের জন্য উপযুক্ত সময় বের করা সহজ নয়।
বাংলাদেশের সামনে ইতোমধ্যে একাধিক সিরিজ রয়েছে। অন্যদিকে ভারতও সারা বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্যস্ত থাকে। এ কারণে দুই বোর্ডকে নিজেদের সূচির সঙ্গে সমন্বয় করেই নতুন সময় নির্ধারণ করতে হবে।
বিসিবি সভাপতি বলেন, কিছু বিষয় বোর্ডের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। তবে সিরিজ আয়োজনের বিষয়ে বিসিবির অবস্থান ইতিবাচক এবং দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
তামিমের ভাষায়, ‘কিছু বিষয় আছে, যেগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বিসিবি সভাপতি হিসেবে আমি কখনোই সেই সীমা অতিক্রম করতে চাই না। তবে আমাদের উদ্দেশ্য ইতিবাচক। নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে, তারিখ নিয়েও আলোচনা চলছে।’
আগেও স্থগিত হয়েছিল ভারত সিরিজ
বাংলাদেশ-ভারত সিরিজটি এর আগেও স্থগিত হয়েছিল। মূলত ২০২৪ সালে সিরিজটি আয়োজনের কথা থাকলেও দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তা পিছিয়ে যায়।
এরপর বিসিবির বছরের শুরুতে প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী, ২৮ সেপ্টেম্বর ভারত বাংলাদেশ সফরে আসার কথা ছিল। তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ হওয়ার কথা ছিল ১, ৩ ও ৬ সেপ্টেম্বর। এরপর তিনটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল ৯, ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর। ওয়ানডেগুলো ঢাকায় এবং টি-টোয়েন্টিগুলো চট্টগ্রামে আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল।
তবে নির্ধারিত সূচিতে সিরিজ আয়োজনের সুযোগ আর নেই। এখন নতুন সময় বের করে দুই বোর্ড সিরিজটি আয়োজন করতে পারে কি না, সেটিই দেখার বিষয়।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলা নিয়েও তামিমের আক্ষেপ
এদিকে ২০২৬ সালের আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েও নিজের মত জানিয়েছেন তামিম ইকবাল।
তার মতে, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ আরও ভালোভাবে আলোচনা ও দর-কষাকষি করতে পারত। বিশেষ করে মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি এবং পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে তিনি যথাযথ মনে করেন না।
২০২৬ সালের আইপিএলের আগে কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কেকেআর) স্কোয়াড থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল। এরপর নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ।
তামিম বলেন, ‘আমার মনে হয়, বিষয়টি আমরা আরও ভালোভাবে আলোচনা করতে পারতাম। মোস্তাফিজের বিষয়টি নিয়ে পুরো দেশই হতাশ হয়েছিল। আমি তখনও বলেছিলাম, আজও বলছি—এটা কখনোই হওয়া উচিত ছিল না। এটা কোনোভাবেই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না।’
‘বিশ্বকাপের সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত হয়নি’
বাংলাদেশের ক্রিকেটে বিশ্বকাপের গুরুত্ব তুলে ধরে তামিম বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মঞ্চগুলোর একটিতে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ কোনোভাবেই সহজে হাতছাড়া করা উচিত নয়।
তিনি স্মরণ করেন, বাংলাদেশ প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করার পর দেশের মানুষের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছিল, সেটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এখন নিয়মিত হলেও সেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার মূল্য কমেনি।
তামিমের ভাষায়, ‘এটি বিশ্বকাপ, যেখানে বাংলাদেশ প্রতিনিধিত্ব করবে। আমার মনে হয়, আমরা বিষয়টি আরও ভালোভাবে সামলাতে পারতাম। শুরু থেকেই আমরা এমন এক জায়গায় চলে গিয়েছিলাম, যেখান থেকে ফেরার পথ কঠিন হয়ে যায়।’
আলোচনার টেবিলে ছিল অনেক তথ্য
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে বাংলাদেশ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনার সময় অনেক কিছু ঘটেছিল বলেও জানিয়েছেন তামিম। তবে আইসিসির সদস্য হিসেবে তিনি এসব বিষয় প্রকাশ্যে আনতে চান না।
তামিম বলেন, আলোচনার সময় এমন অনেক কথা বলা ও ঘটনা ঘটেছিল, যা প্রকাশ্যে এলে মানুষ অবাক হতে পারে। কিন্তু দায়িত্ব ও সম্মানের জায়গা থেকে তিনি সেসব তথ্য প্রকাশ করবেন না।
তিনি বলেন, ‘আমি এখন আইসিসির সদস্য। বিসিবির কারণেই আমি আইসিসির সদস্য। সেই আলোচনার সময় অনেক কিছু বলা ও করা হয়েছিল। আমি যদি সেগুলো প্রকাশ্যে বলি, আপনারা অবাক হবেন। কিন্তু আমি সেগুলো বলতে পারব না।’
‘বাইরে থেকে বিচার করা আর ভেতরের তথ্য এক নয়’
তামিম আরও বলেন, কোনো একটি ঘটনা বাইরে থেকে দেখা এবং সেই ঘটনার আলোচনায় সরাসরি যুক্ত থাকা ব্যক্তিদের কাছে থাকা তথ্য এক নয়। যারা আলোচনার টেবিলে ছিলেন, তারা পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অনেক বেশি তথ্য জানতেন।
তাঁর মতে, বাইরে থেকে যে সিদ্ধান্ত বা মতামত দেওয়া হয়, তা অনেক সময় অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে হতে পারে। পরে বিভিন্ন কথোপকথন ও ঘটনার বিষয়ে জানার পর তাঁর মনে হয়েছে, বাংলাদেশ চাইলে পুরো বিষয়টি আরও সতর্ক ও কৌশলীভাবে সামলাতে পারত।
বাংলাদেশ-ভারত সিরিজ নিয়ে এখন দুই দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের নজর নতুন সম্ভাব্য সূচির দিকে। দুই বোর্ডের ইতিবাচক মনোভাব এবং নিয়মিত যোগাযোগ শেষ পর্যন্ত সিরিজটি মাঠে গড়ানোর পথ তৈরি করে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
পাঠকের মন্তব্য