
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
নেপালে ভয়াবহ হিমবাহজনিত বন্যায় মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়ানোর পর হিমালয় অঞ্চলে ভবিষ্যৎ দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়া ও পাহাড়ি অঞ্চলের প্রাকৃতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ায় সামনে আরও ভয়াবহ হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ধরনের দুর্যোগ শুধু মানুষের জীবন ও বসতিকে হুমকির মুখে ফেলবে না, একই সঙ্গে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা এবং নদীতীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। লাখ লাখ মানুষের বসবাস করা বিস্তীর্ণ এলাকা দীর্ঘমেয়াদে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব কান্নি উইগনারাজা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, হিমবাহ-হ্রদের অতিরিক্ত পানি যে বিশাল নদী ব্যবস্থার মাধ্যমে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়, সেসব এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানোর মতো প্রযুক্তি প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট দ্রুত এগোচ্ছে না।
বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদের সংখ্যা বাড়ছে
২০২০ সালে গবেষকেরা নেপাল, চীন ও ভারতে সম্ভাব্য বিপজ্জনক ৪৭টি হিমবাহ-হ্রদ শনাক্ত করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে এসব অঞ্চলে প্রকৃত ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ-হ্রদের সংখ্যা ওই হিসাবের চেয়েও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক উইগনারাজা জানান, হিমবাহজনিত দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে পৌঁছেছে। জুন মাসে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি ও সহযোগী সংস্থাগুলোর সংকলিত হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে তিনি এ আশঙ্কার কথা জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমবাহ দ্রুত গলে গেলে পাহাড়ের ঢাল ও শিলাস্তরের স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে গলিত পানি জমে হিমবাহ-হ্রদের আকার বাড়তে থাকে। কোনো পর্যায়ে হ্রদের পানি আটকে রাখা প্রাকৃতিক বাঁধ দুর্বল হয়ে ভেঙে গেলে নিম্নাঞ্চলে হঠাৎ ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে।
নেপালের ভয়াবহ বন্যা নতুন সতর্কবার্তা
গত সপ্তাহে নেপালে ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত হয় লাংটাং লিরুং পর্বতশৃঙ্গের কাছে একটি হিমবাহের অংশ ধসে পড়ার পর। হিমবাহের ধস উপত্যকার তলদেশে পড়ে ভূমিধস সৃষ্টি করে। পরে সেই ভূমিধসের প্রভাবে ত্রিশূলী নদী দিয়ে নিচের দিকে প্রবল বন্যার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে।
তবে হিমবাহ ধস এবং হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক বাঁধভাঙা বন্যা এক ধরনের ঘটনা নয়। হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক বাঁধভাঙা বন্যা সাধারণত ঘটে যখন গলে যাওয়া বরফের পানি কোনো প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকের পেছনে জমতে জমতে একপর্যায়ে সেই বাঁধ ভেঙে দেয় বা পানি উপচে পড়ে। তখন অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি নদীর নিম্নপ্রবাহে নেমে গিয়ে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলে এ দুই ধরনের ঝুঁকিই বাড়ছে বলে সতর্ক করছেন জাতিসংঘের কর্মকর্তারা।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে ঝুঁকি
হিমবাহ গলার গতি বেড়ে যাওয়ার ফলে পাহাড়ের শিলাস্তর আলগা হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি হিমবাহ-হ্রদের পানি আটকে রাখা প্রাকৃতিক বাঁধের ওপরও চাপ বাড়ছে। ফলে সামান্য ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন বা বড় ধরনের ধস পুরো পরিস্থিতিকে দ্রুত দুর্যোগে পরিণত করতে পারে।
উইগনারাজা বলেন, হিমালয় অঞ্চলের পাহাড়গুলো তুলনামূলকভাবে নবীন। এ কারণে ভূ-অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের প্রভাব এখানে বেশি দেখা যেতে পারে। পাহাড়ের নড়াচড়া বা ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলে হিমবাহ কিংবা হিমবাহ-হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ হঠাৎ ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পাশাপাশি ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতাও হিমালয় অঞ্চলের দুর্যোগ ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
হিমবাহের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা নেপালের
হিন্দুকুশ পর্বতমালা ঘিরে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদ শনাক্ত করা হয়েছে। তবে পানি সরবরাহ ও মানুষের জীবিকার দিক থেকে নেপাল এ অঞ্চলের অন্য অনেক দেশের তুলনায় হিমবাহের ওপর বেশি নির্ভরশীল।
জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের মতে, এ কারণে হিমবাহজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় নেপালকে অত্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
নদীতীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী অনেক মানুষের পক্ষে নিরাপদ উঁচু এলাকায় স্থানান্তরিত হওয়া আর্থিকভাবে সম্ভব নাও হতে পারে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
ঝুঁকিতে জলবিদ্যুৎ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো
হিমবাহজনিত বন্যার অন্যতম বড় প্রভাব পড়তে পারে নেপালের জলবিদ্যুৎ খাতে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অর্থনীতিতে জলবিদ্যুতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে বড় ধরনের হিমবাহ ধস বা বন্যা হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি হতে পারে।
জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি জানিয়েছে, গত সপ্তাহের বন্যায় চালু থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি নির্মাণাধীন ১৫টি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অথবা অচল হয়ে পড়েছে।
শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা ও নদীতীরবর্তী অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
প্রযুক্তিতে প্রতিরোধের চেষ্টা
জাতিসংঘের কর্মকর্তারা মনে করছেন, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্রকে বন্যার মতো দুর্যোগের বিরুদ্ধে আরও সহনশীল করে তোলা সম্ভব। ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ-হ্রদ পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কতা এবং উন্নত নজরদারি ব্যবস্থাও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা দেখিয়েছে, সব ধরনের দুর্যোগকে বিদ্যমান অবকাঠামো দিয়ে ঠেকানো সম্ভব নয়।
উইগনারাজার ভাষ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে নেপালে যে কাদা ও বরফের প্রবল স্রোত নেমে এসেছিল, তার ভয়াবহতা এতটাই বেশি ছিল যে বিদ্যমান অধিকাংশ প্রতিরোধব্যবস্থা তা সামাল দিতে পারেনি।
এই পরিস্থিতিতে হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে।
পাঠকের মন্তব্য