![]()
আহমেদ তোফায়েল
ট্রেজারি বন্ড দীর্ঘমেয়াদি (২ থেকে ২০ বছর)। এতে প্রতি ৬ মাস অন্তর মুনাফা বা ‘কুপন’ পাওয়ার সুবিধা থাকে
বর্তমানে মুনাফার হার বেশ আকর্ষণীয়। স্বল্পমেয়াদি বিলে ১০.১৭% থেকে ১০.৬৪% পর্যন্ত মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে
দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের (১৫-২০ বছর) ক্ষেত্রে মুনাফার হার ১১.১৫% থেকে ১১.২৩% পর্যন্ত
সরকার এখানে গ্যারান্টর হওয়ায় টাকা হারানোর ঝুঁকি নেই
সঞ্চয়পত্রের মতো এখানে বিনিয়োগের কোনো সর্বোচ্চ সীমা নেই। ন্যূনতম ১ লাখ টাকা থেকে যেকোনো পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা যায়
প্রয়োজনে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সেকেন্ডারি মার্কেটে বন্ড বিক্রি করে টাকা সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে
দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে সঞ্চয়পত্র ও স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) বাইরে এক শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড। এক সময় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নাগালের বাইরে মনে করা হলেও, বর্তমানে উচ্চ মুনাফা এবং শতভাগ নিরাপত্তার কারণে এসব সরকারি সিকিউরিটিজে মানুষের আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা এবং এফডিআরের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকেই এখন ঝুঁকির বদলে নিশ্চিত মুনাফার জন্য ট্রেজারি বন্ডকে বেছে নিচ্ছেন।
গত কয়েক বছর ধরে দেশের ব্যাংক খাতে তারল্যের ওঠানামা এবং বিনিয়োগের সীমিত সুযোগের প্রেক্ষাপটে সরকারি এই ঋণপত্রগুলো সাধারণ নাগরিকদের জন্য বড় আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করলে শুধু যে ভালো মুনাফা পাওয়া যায় তা নয়, বরং প্রয়োজনে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সেকেন্ডারি মার্কেটে তা বিক্রি করে টাকা সংগ্রহের সুযোগও রয়েছে। যা সাধারণ এফডিআরের তুলনায় অনেক বেশি সুবিধাজনক।
ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মূল পার্থক্য
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সহজভাবে বোঝার জন্য সরকারি সিকিউরিটিজকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হলো স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি বিল (টি-বিল) এবং অন্যটি দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ড। ৯১ দিন, ১৮২ দিন এবং ৩৬৪ দিনের মেয়াদে যে ঋণপত্রগুলো ইস্যু করা হয়, সেগুলোকে বলা হয় ট্রেজারি বিল। এগুলো সাধারণত ডিসকাউন্ট বা বাট্টা মূল্যে বিক্রি হয়। সহজ কথায়, আপনি যদি এক লাখ টাকার বিল কেনেন, তবে আপনাকে দিতে হবে তার চেয়ে কিছুটা কম টাকা। মেয়াদ শেষে আপনি যখন পুরো এক লাখ টাকা ফেরত পাবেন, তখন ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের পার্থক্যই হবে আপনার নিট মুনাফা।
অন্যদিকে, ট্রেজারি বন্ড হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এর মেয়াদ ২ বছর থেকে শুরু করে ২০ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে। ট্রেজারি বন্ডের বড় সুবিধা হলো কুপন বা সুদের হার। ছয় মাস পরপর বিনিয়োগকারী তার পাওনা মুনাফা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে পেয়ে থাকেন। দীর্ঘমেয়াদে যারা পারিবারিক নিরাপত্তা বা অবসরের কথা ভাবছেন, তাদের জন্য এই বন্ড একটি আদর্শ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সুদের হার ও মুনাফার চিত্র
বর্তমানে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মুনাফার হার ব্যাংকের এফডিআর কিংবা সঞ্চয়পত্রের তুলনায় কোনো অংশেই কম নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ৯১ দিনের ট্রেজারি বিলে সুদের হার ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ পর্যন্ত উঠছে। এছাড়া ৩৬৪ দিনের বিলে মুনাফা মিলছে ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ। দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের ক্ষেত্রে এই হার আরও আকর্ষণীয়। ২ থেকে ৩ বছর মেয়াদি বন্ডে ১০ দশমিক ২ থেকে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে যারা বিনিয়োগ করছেন, যেমন ১৫ বা ২০ বছরের বন্ডে, তারা ১১ দশমিক ১৫ থেকে ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা পাচ্ছেন। এই উচ্চ মুনাফার হারই মূলত সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ট্রেজারি বন্ডের দিকে ধাবিত করছে।
নিরাপত্তা ও বিনিয়োগের সীমা
ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো এর সার্বভৌম নিরাপত্তা । যেহেতু এখানে স্বয়ং সরকার ঋণের গ্যারান্টর, তাই টাকা হারানোর কোনো ঝুঁকি নেই। দেশের যেকোনো ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার তাত্ত্বিক ঝুঁকি থাকলেও সরকারের ক্ষেত্রে সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এছাড়া সঞ্চয়পত্রের মতো এখানে বিনিয়োগের কোনো নির্দিষ্ট ঊর্ধ্বসীমা নেই। একজন বিনিয়োগকারী চাইলে এক লাখ টাকা থেকে শুরু করে যেকোনো অঙ্কের অর্থ এখানে বিনিয়োগ করতে পারেন। ন্যূনতম বিনিয়োগের পরিমাণ মাত্র এক লাখ টাকা হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত উভয় শ্রেণির জন্যই এটি একটি কার্যকর ক্ষেত্র।
কারা এবং কীভাবে কিনবেন
দেশের সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে অনাবাসিক বাংলাদেশি, ব্যাংক, বিমা কোম্পানি, করপোরেট সংস্থা কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ তহবিলের অর্থ এখানে বিনিয়োগ করা সম্ভব। তবে এর জন্য একজন বিনিয়োগকারীকে কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি বিজনেস পার্টনার আইডেন্টিফিকেশন বা ‘বিপি আইডি’ খুলতে হয়। এই হিসাব খোলার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন), ছবি এবং একটি সচল ব্যাংক হিসাব থাকা বাধ্যতামূলক।
বাজার বিন্যাস ও নতুন প্রাইমারি ডিলার
সরকার সাধারণত নিলামের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বাজার থেকে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। এই নিলাম প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নেয় নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংক, যাদের ‘প্রাইমারি ডিলার’ (পিডি) বলা হয়। বর্তমানে দেশে ২৪টি ব্যাংক এই দায়িত্ব পালন করে আসছিল। তবে সম্প্রতি সরকারের অর্থ বিভাগ ব্র্যাক ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংককে নতুন পিডি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এর ফলে দেশে মোট পিডি ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬টিতে।
সোনালী ব্যাংক বন্ড কেনার ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগতভাবেই শীর্ষে থাকলেও অগ্রণী, জনতা, সিটি, ইস্টার্ন এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মাধ্যমেও সাধারণ মানুষ বন্ড কিনতে পারছেন। নতুন পিডি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাতউল্লাহ খান জানিয়েছেন, বন্ড বাজারে সক্রিয় ভূমিকা রাখার লক্ষ্যেই তারা আবেদন করেছিলেন এবং এখন থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বন্ড বাজারে প্রবেশাধিকার সহজ করতে তারা কাজ করবেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ট্রেজারি বন্ডের বাজার যত শক্তিশালী হবে, সরকারের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়া তত বেশি সুশৃঙ্খল হবে। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়লে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর সরকারের অতি-নির্ভরশীলতা কমবে, যা বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ সচল রাখতে সহায়তা করবে। এছাড়া সেকেন্ডারি মার্কেটে বন্ডের লেনদেন জনপ্রিয় হলে এটি শেয়ার বাজারের বিকল্প হিসেবে একটি স্থিতিশীল বন্ড মার্কেট তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।
পরিশেষে বলা যায়, মুদ্রাস্ফীতির এই সময়ে অলস টাকা ঘরে বা সাধারণ ব্যাংক হিসাবে না রেখে ট্রেজারি বিল বা বন্ডে বিনিয়োগ করা একটি বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। মেয়াদপূর্তির আগে অর্থ ফেরত পাওয়ার সুবিধা এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর মুনাফা লাভের সুযোগ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য এটি একটি আধুনিক ও নিরাপদ আর্থিক মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যথাযথ প্রচার ও সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে পারলে আগামীতে ট্রেজারি বন্ডই হতে পারে সাধারণ মানুষের প্রধান আর্থিক সম্পদ।