![]()
আহমেদ তোফায়েল
দেশের সাধারণ মানুষের কাছে কষ্টের জমানো টাকা নিরাপদ কোনো খাতে বিনিয়োগ করাটা সবসময়ই বড় চ্যালেঞ্জের। প্রচলিত ব্যবধানে মানুষ সাধারণত সঞ্চয়পত্র, মেয়াদী আমানত (এফডিআর) কিংবা সাধারণ বন্ডে বিনিয়োগ করে থাকেন। তবে বিনিয়োগের এই চিরাচরিত তালিকায় এখন শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে যুক্ত হয়েছে ‘সুকুক’ বা শরিয়াহভিত্তিক বন্ড।
এই খাতে সাধারণ গ্রাহক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ আরও সহজ এবং গতিশীল করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রক্রিয়া সহজীকরণের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে মাশুল কাঠামো, যাতে সাধারণ মানুষ খুব সহজেই এই আধুনিক বিনিয়োগ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে সুকুক ইনভেস্টর আইডি খোলার প্রক্রিয়া এবং এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্রের বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে সুকুককে জনপ্রিয় করতে। এখন থেকে নির্দিষ্ট মাশুল এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে যেকোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সুকুক ইনভেস্টর আইডি বা বিনিয়োগকারী আইডি খোলা যাবে। এই আইডির মাধ্যমেই মূলত গ্রাহক সরকারি এই সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করতে পারবেন।
বিনিয়োগ আইডি খুলতে যা প্রয়োজন
সুকুক বিনিয়োগের প্রথম ধাপ হলো একটি ইনভেস্টর আইডি খোলা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগকারীর জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্রে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। সাধারণ ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে একটি পূর্ণাঙ্গ আবেদন ফরমের সঙ্গে ব্যাংক হিসাবের তথ্য, জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট, ছবি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ জমা দিতে হবে। এছাড়া নমিনির ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
অনিবাসী বা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রক্রিয়াটি কিছুটা ভিন্ন। তাদের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট ও প্রবাসীদের জন্য নির্দিষ্ট দেশি মুদ্রা ‘টাকা হিসাব’-এর তথ্য প্রদান করতে হবে। অন্যদিকে, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা লিমিটেড কোম্পানির মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে মেমোরেন্ডাম ও আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন, বোর্ড রেজোল্যুশন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লাইসেন্স এবং নিবন্ধিত ঠিকানার তথ্য প্রয়োজন হবে। এছাড়া ট্রাস্ট ফান্ড, পেনশন বা প্রভিডেন্ট ফান্ডের ক্ষেত্রে ট্রাস্ট ডিড ও এনবিআর-এর সনদের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একক মালিকানা বা অংশীদারি ব্যবসার ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স ও অংশীদারি দলিল প্রদান করতে হবে।
মাশুল কাঠামো ও ব্যয়ের হিসাব
বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক সুকুক লেনদেনের মাশুল কাঠামো অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি বিনিয়োগকারীকে আইডি খোলা, প্রাথমিক নিলামে অংশগ্রহণ এবং বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ মাশুল হিসেবে প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা করে দিতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে এই মাশুলের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা।
সেকেন্ডারি মার্কেটে অর্থাৎ যারা শেয়ার বাজারের মতো সুকুক কেনাবেচা করতে চান, তাদের জন্য প্রতি লেনদেনে ১০০ টাকা মাশুল নির্ধারণ করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা বছরে একটি আয়কর সনদ বিনামূল্যে পাবেন, তবে এর অতিরিক্ত সনদের জন্য ব্যক্তি পর্যায়ে ২০০ এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ৫০০ টাকা মাশুল প্রযোজ্য হবে। উল্লেখ্য, এই সব মাশুলের সঙ্গেই ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
বিনামূল্যে মিলবে যেসব সেবা
সাধারণ গ্রাহকদের উৎসাহিত করতে বেশ কিছু সেবা সম্পূর্ণ মাশুলমুক্ত রাখা হয়েছে। বিনিয়োগের বিপরীতে অর্জিত মুনাফা, ভাড়া বা আসল টাকা যখন বিনিয়োগকারীর হিসাবে পাঠানো হবে, তখন ব্যাংক কোনো ধরনের মাশুল কাটতে পারবে না। এছাড়া নিজের বিনিয়োগের পরিমাণ বা হোল্ডিং রিপোর্ট সংগ্রহ এবং সুকুক আইডি বন্ধ করার জন্য কোনো চার্জ বা মাশুল দিতে হবে না। এতে বিনিয়োগকারীদের বাড়তি ব্যয়ের দুশ্চিন্তা কমবে।
আবেদন প্রক্রিয়া ও কারিগরি দিক
ইচ্ছুক বিনিয়োগকারীদের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ‘গভর্নমেন্ট সিকিউরিটিজ বিনিয়োগ উইন্ডো’-তে গিয়ে আবেদন করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে বাংলাদেশ ব্যাংকে সংরক্ষিত শরিয়াহ সিকিউরিটি মডিউলের মাধ্যমে। এটি একটি আধুনিক ও ডিজিটাল ব্যবস্থা, যার ফলে বিনিয়োগের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
সংশ্লিষ্ট খাতের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিনিয়োগের এই নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার ফলে দেশের অর্থবাজারে তারল্য ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে যারা ধর্মীয় কারণে সুদমুক্ত বিনিয়োগ খুঁজছেন, তাদের জন্য সুকুক একটি আদর্শ প্ল্যাটফর্ম। প্রক্রিয়ার এই সহজীকরণ কেবল বড় বিনিয়োগকারীদের নয়, বরং মধ্যবিত্ত ও সাধারণ পেশাজীবীদেরও বিনিয়োগে আগ্রহী করে তুলবে। এর ফলে সরকার যেমন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ন পাবে, তেমনি সাধারণ মানুষও ব্যাংকের সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাবের তুলনায় ভালো ও নিরাপদ মুনাফা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
পরিশেষে বলা যায়, সঞ্চয়পত্র বা এফডিআরের পাশাপাশি সুকুক এখন একটি শক্তিশালী বিনিয়োগ পণ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ এবং সহজ মাশুল কাঠামো সাধারণ মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়াতে সহায়ক হবে। আধুনিক এই বিনিয়োগ ব্যবস্থাটি সঠিকভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে তা এক নতুন গতি সঞ্চার করবে এবং দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মুনাফার হার
বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি সুকুক বা শরিয়াহভিত্তিক বন্ডের বার্ষিক মুনাফার হার সাধারণত ১০.৪০% থেকে ১০.৫০%। সুকুক মূলত একটি সম্পদ-ভিত্তিক বিনিয়োগ পদ্ধতি, যেখানে প্রচলিত বন্ডের মতো ‘সুদ’ না দিয়ে সম্পদের ভাড়ার বা অর্জিত মুনাফার অংশ প্রদান করা হয়।
বৈশিষ্ট্যসমূহ
সাম্প্রতিক ৭ বছর মেয়াদি ইজারা সুকুকের ক্ষেত্রে বার্ষিক মুনাফার হার ১০.৪০%। কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্পের ধরনভেদে এটি ১০.৫০% পর্যন্ত হতে পারে।
সাধারণত প্রতি ৬ মাস অন্তর (অর্ধ-বার্ষিক) বিনিয়োগকারীদের মুনাফা প্রদান করা হয়।
সর্বনিম্ন ১০,০০০ টাকা থেকে এই বন্ডে বিনিয়োগ শুরু করা যায়। সরকারি সুকুক সাধারণত ৭ বছর মেয়াদি হয়ে থাকে।
কেন এটি প্রচলিত বন্ড থেকে আলাদা?
প্রচলিত বন্ডে নির্দিষ্ট হারে সুদ দেওয়া হয়, যা ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী নিষিদ্ধ। অন্যদিকে, সুকুক হলো কোনো নির্দিষ্ট সম্পদ বা প্রকল্পের আংশিক মালিকানা সনদ, যেখান থেকে অর্জিত প্রকৃত মুনাফা বা ভাড়া বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
সরকারি সুকুক বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গ্যারান্টিযুক্ত থাকে, তাই এটি একটি অত্যন্ত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত। সুকুক থেকে প্রাপ্ত মুনাফা সাধারণত করমুক্ত হওয়ার সুবিধা থাকে। ##