![]()
আহমেদ তোফায়েল
লক্ষ্য: বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান বা এন্টারপ্রাইজ পর্যায়ের জটিল কর্মপ্রবাহ ও কোডিং ব্যবস্থাকে এআই-এর মাধ্যমে সহজ ও গতিশীল করা।
এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে ব্যবহারকারী কোনো কোডিং জ্ঞান ছাড়াই তাদের কাজের প্রক্রিয়া বর্ণনা করলে এআই নিজে থেকেই প্রয়োজনীয় কোড তৈরি করে সমাধান দেবে।
কর্মীদের ম্যানুয়াল ডেটা এন্ট্রি, স্প্রেডশিট সামলানো বা পুরোনো সফটওয়্যারের জটিলতা থেকে মুক্তি দিয়ে সৃজনশীল কাজে সময় দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।
২০২৩ সালে এআই কোডিং বাজারের আকার ছিল ৪.৯ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ গুণ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
ইতোমধ্যে থ্রি, স্টেনা রিসাইক্লিং এবং ক্রাই -এর মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এই সেবা ব্যবহার শুরু করেছে।
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির জয়জয়কার এখন আর কেবল চ্যাটবট বা ছবি তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক ব্যবসায়িক জগতের জটিল কর্মপ্রবাহ এবং কোডিং ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে এআই এখন এক অপরিহার্য শক্তি। এই উদীয়মান বাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে এবং বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও গতিশীল করতে ১৬ মিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক মূলধন সংগ্রহ করেছে সুইডিশ স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান ‘পিট’।
এআই কোডিং বাজারের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই বিনিয়োগকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা। ২০২৩ সালে এআই কোডিং বাজারের আকার ছিল প্রায় ৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। বাজার গবেষণা সংস্থা ‘গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চ’-এর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাতের বাজার পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালনা এবং গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করতে কোডিংয়ের সিংহভাগ কাজই এআই-এর মাধ্যমে করিয়ে নিচ্ছে। ঠিক এই সময়েই সুইডেনভিত্তিক স্টার্টআপ ‘পিট’ তাদের উদ্ভাবনী পরিকল্পনা নিয়ে বাজারে জোরালো উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।
‘পিট’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মতে, সাধারণ এআই কোডিং টুলগুলোর সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বড় আকারের বা এন্টারপ্রাইজ পর্যায়ে এআই মোতায়েন করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। বাজারের অন্যান্য প্রতিযোগীদের তুলনায় ‘পিট’ নিজেকে আলাদা করছে মূলত স্কেলেবল বা সম্প্রসারণযোগ্য সমাধানের দিকে বিশেষ নজর দিয়ে। তারা মনে করেন, বাজারে বর্তমানে বিদ্যমান অনেক টুল কোড তৈরি করতে পারলেও সেগুলো পুরো প্রতিষ্ঠানের কাঠামোতে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন বা দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখার বিষয়ে খুব একটা ভাবছে না। এই শূন্যস্থান পূরণ করতেই ‘পিট’-এর যাত্রা শুরু।
প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডাম জাফার এই উদ্যোগের পেছনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই এই ভাবনার জন্ম। এর আগে তিনি মাইক্রো-মোবিলিটি কোম্পানি ‘ভয়’ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় তিনি লক্ষ্য করেন যে, তাদের নেতৃত্বাধীন দল কোডিংয়ের কাজে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগামী ছিল। তারা কর্মপ্রবাহ বা ওয়ার্কফ্লো ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু নিজস্ব টুলও তৈরি করেছিল। কিন্তু শুরুর দিকে ভালো ফল পাওয়া গেলেও বড় সমস্যাটি দেখা দেয় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। অ্যাডাম জাফারের মতে, সেই সময় প্রতিটি এআই মোতায়েন ছিল অগোছালো, ভঙ্গুর এবং এগুলো বড় পরিসরে ব্যবহারের অযোগ্য ছিল।
এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই অ্যাডাম জাফার এবং ক্লারনা ও আইজেটলের মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন তার সহ-প্রতিষ্ঠাতারা একটি ব্যবহারিক এবং কার্যকর প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজে হাত দেন। তাদের তৈরি প্ল্যাটফর্ম ‘পিট’-এর লক্ষ্য হলো এমন সব শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়াকে এড়িয়ে যাওয়া, যা সময়ের সাথে সাথে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানের অধিকাংশ বড় কোম্পানি এক ধরনের তালিমারা বা প্যাচওয়ার্কের ওপর ভিত্তি করে চলছে। যেখানে ম্যানুয়াল ওয়ার্কফ্লো, অসংখ্য স্প্রেডশিট এবং পুরোনো ধাঁচের সফটওয়্যার টুল বা ‘সাস’ ব্যবহারের ছড়াছড়ি। এর ফলে কর্মীদের দিনের বড় একটি সময় নষ্ট হয় এক সিস্টেম থেকে অন্য সিস্টেমে তথ্য স্থানান্তর করতে এবং সবকিছু ঠিকঠাক চলছে কি না তা বারবার পরীক্ষা করতে।
অ্যাডাম জাফার মনে করেন, প্রতিটি বড় প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই এই ধরনের ঘর্ষণ বা সমস্যা বিদ্যমান। কিন্তু এগুলো সমাধান করা এতটাই কঠিন মনে হয় যে, প্রতিষ্ঠানগুলো শেষ পর্যন্ত এই সমস্যার সাথেই মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ‘পিট’ এই জায়গাতেই পরিবর্তন আনতে চায়। তাদের সেবার মূল বিশেষত্ব হলো, একজন সাধারণ ব্যবহারকারী কোনো কোডিং জ্ঞান ছাড়াই প্ল্যাটফর্মটিকে বলতে পারবেন তাদের নির্দিষ্ট কোনো কাজ বা ওয়ার্কফ্লো কীভাবে সম্পন্ন হয়। একবার এই প্রক্রিয়াটি মানচিত্রের মতো তৈরি করে দিলে ‘পিট’ স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি সমাধান নকশা করবে এবং প্রয়োজনীয় কোড তৈরি করে কাজটির দায়িত্ব নেবে। ব্যবহারকারীরা শুধু এটি পরীক্ষা করবেন এবং এরপর তা কার্যকর করবেন।
এই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অ্যাডাম জাফার বেশ আশাবাদী। তিনি জানিয়েছেন, এটি কোনোভাবেই মানুষকে প্রতিস্থাপন করার জন্য তৈরি হয়নি। বরং কর্মীদের হাতে মূল্যবান সময় ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্ভাবন। যখন একটি কোম্পানি বড় হতে থাকে, তখন সীমিত সম্পদ দিয়ে আরও বেশি কাজ করার সক্ষমতা তৈরি করে দেয় এই এআই প্ল্যাটফর্ম।
শুরুতেই ‘পিট’-এর কার্যকারিতার ইতিবাচক প্রমাণ মিলতে শুরু করেছে। বর্তমানে প্রায় ডজনখানেক গ্রাহক প্রতিষ্ঠান তাদের ওয়ার্কফ্লো অটোমেশনের কাজে ‘পিট’ ব্যবহার করছে। এর মধ্যে থ্রি (Tre), স্টেনা রিসাইক্লিং (Stena Recycling) এবং ক্রাই (Kry)-এর মতো নামী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। মূলত শিল্পখাত এবং বাস্তব অর্থনীতির সাথে সরাসরি যুক্ত ব্যবসায়িক ক্ষেত্রগুলোতে ‘পিট’ বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, যেখানে এখন পর্যন্ত এআই প্রযুক্তির ছোঁয়া সেভাবে লাগেনি।
তবে এই যাত্রা মোটেও নিরঙ্কুশ নয়। বাজারে লাভঅ্যাবল, কারসার এবং বোল্টের মতো পরিচিত এআই কোডিং অ্যাপগুলো বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে। পাশাপাশি টেক জায়ান্ট অ্যানথ্রোপিকের ‘ক্লড কোড’ও এই প্রতিযোগিতার ময়দানে বড় খেলোয়াড়। তবে অ্যাডাম জাফার তাদের আসল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মনে করেন ডিস্টাইল, এডরা বা ওয়ান্ডারফুলের মতো কোম্পানিগুলোকে, যারা কোডিংয়ের পাশাপাশি তার বাস্তবায়নের দিকেও নজর দিচ্ছে এবং গত এক বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগ পেয়েছে।
এতসব প্রতিযোগীর ভিড়েও ‘পিট’-এর ওপর বড় বিনিয়োগকারীদের আস্থা অটুট রয়েছে। বর্তমানের ১৬ মিলিয়ন ডলারের এই বিনিয়োগ রাউন্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছে সিলিকন ভ্যালির প্রভাবশালী ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম আন্দ্রেসেন হোরোউইটজ (a16z)। প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল পার্টনার অ্যালেক্স র্যাম্পেল মনে করেন, বাজারে থাকা প্রতিটি এআই কোম্পানিই মূলত দ্রুততার কথা বলছে। কিন্তু ‘পিট’ যা বিক্রি করছে তা হলো এমন এক গতি যা বছরের পর বছর টিকে থাকবে। এটি নিরাপদ, সুশাসিত এবং টেকসই হওয়ার মতো করে তৈরি করা হয়েছে। তিনি এটিকে একটি সম্পূর্ণ নতুন ক্যাটাগরির প্রযুক্তি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘ তালিকায় আরও রয়েছে লেকস্টার-এর মতো প্রতিষ্ঠান। এছাড়া ওপেনএআই, অ্যানথ্রোপিক, গুগল, ডিল এবং রেভোলুট-এর মতো বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও ব্যক্তিগতভাবে এই উদ্যোগে বিনিয়োগ করেছেন। এমনকি স্টেনা এবং লুন্ডিন পরিবারও স্টকহোম-ভিত্তিক এই কোম্পানিটির ওপর ভরসা রেখেছে।
পরিশেষে বলা যায়, এআই কোডিং প্রযুক্তির এই উত্থান বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনশীলতার ধারণাকে বদলে দিচ্ছে। ‘পিট’-এর মতো স্টার্টআপগুলো কেবল কোড লেখাই নয়, বরং সেই কোডকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগানো যায়, তার একটি টেকসই সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করছে। যদি এই মডেল সফল হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে কায়িক শ্রমের বদলে এআই-নির্ভর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার এক নতুন রূপ দেখা যাবে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
তথ্যসূত্র: বিশ্বখ্যাত সাময়িকী ‘ ফোর্বস’ ম্যাগাজিন এবং গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চ।