![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশজুড়ে হামের টিকার সংকট কাটতে না কাটতেই এবার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে জলাতঙ্ক বা র্যাবিস টিকার সংকট। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) কার্যক্রমে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা, স্বাস্থ্য খাতের অপারেশনাল পরিকল্পনা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কেন্দ্রীয়ভাবে টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থার ব্যাঘাতের কারণে দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে দেখা দিয়েছে র্যাবিস ভ্যাকসিনের তীব্র সংকট। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শিশু, নারী ও প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ে আহত সাধারণ মানুষ।
খুলনা জেনারেল হাসপাতালে বুধবার সকালে দেখা যায় শতাধিক রোগীর দীর্ঘ লাইন। সবাই এসেছেন জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা নিতে। কিন্তু হাসপাতালে গিয়ে রোগীরা জানতে পারেন, সরকারি সরবরাহে কোনো টিকা নেই। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে অনেক পরিবারকে বাইরে থেকে চড়া দামে ভ্যাকসিন কিনতে হচ্ছে।
ছয় বছরের শিশু আশা মনিকে নিয়ে তার মা আয়শা বেগম হাসপাতালে এসে পড়েন চরম দুর্ভোগে। কয়েকদিন আগে পোষা বিড়ালের আঁচড়ে আহত হওয়ার পর মেয়েকে র্যাবিস টিকা দিতে হাসপাতালে আনেন তিনি। কিন্তু সরকারি টিকা না পেয়ে বাইরে থেকে ৮০০ টাকা খরচ করে টিকা কিনতে হয়েছে তাকে।
আয়শা বেগম বলেন, “সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে টিকা পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু টিকা না থাকায় বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়েছে। গরিব মানুষের জন্য এটা খুব কষ্টের।”
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে নিয়মিত র্যাবিস ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হতো। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতের পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রায় এক বছর ধরে কেন্দ্রীয় টিকা সংগ্রহ কার্যক্রমে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। এরপর ধীরে ধীরে সংকট ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায়।
বগুড়াতেও একই চিত্র দেখা গেছে। নারী উদ্যোক্তা তাহমিনা পারভীন শামলী পোষা বিড়ালের আঁচড়ে আহত হওয়ার পর প্রথমে বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল এবং পরে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। কিন্তু কোথাও র্যাবিস টিকা পাননি।
তিনি বলেন, “দুই হাসপাতাল ঘুরেও টিকা পাইনি। ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ার পর আতঙ্কে আর কোথাও যাইনি। এখন সবসময় ভয় কাজ করছে।”
দেশের বিভিন্ন পরিবারে এখন পোষা প্রাণী পালনের প্রবণতা বাড়ছে। ফলে কুকুর বা বিড়ালের কামড় এবং আঁচড়ের ঘটনা আগের তুলনায় বেড়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, জলাতঙ্ক প্রতিরোধে দ্রুত টিকা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু টিকা সংকট পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
বগুড়ার সিভিল সার্জন ডা. মো. খুরশীদ আলম জানিয়েছেন, মাসখানেক আগেও সংকট ছিল চরম পর্যায়ে। পরে সরকারি সিদ্ধান্তে হাসপাতালগুলোকে নিজস্ব তহবিল থেকে সীমিত পরিমাণ টিকা কেনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় সেই সরবরাহ এখনও অনেক কম।
নওগাঁ, রাজশাহী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় একই সংকটের খবর পাওয়া গেছে। কোথাও অল্প কিছু টিকা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাতঙ্ক নির্মূলে বাংলাদেশ গত এক দশকে বড় অগ্রগতি অর্জন করেছিল। মানুষ ও কুকুরকে টিকাদানের মাধ্যমে জলাতঙ্কে মৃত্যুহার ৯০ শতাংশের বেশি কমে আসে। কিন্তু বর্তমানে কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, “অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধ করে দেওয়া ছিল হঠকারী সিদ্ধান্ত। এতে দেশের জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার বড় ক্ষতি হয়েছে। এখন ২০৩০ সালের মধ্যে জলাতঙ্ক নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।”
তিনি আরও জানান, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ মানুষ কুকুর, বিড়াল ও অন্যান্য প্রাণীর কামড়ের শিকার হন। আগে কেন্দ্রীয়ভাবে দ্রুত টিকা সংগ্রহ করা হলেও এখন দীর্ঘ ক্রয় প্রক্রিয়ার কারণে কয়েক মাস বিলম্ব হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, সরকার ইতোমধ্যে নতুন পরিকল্পনায় ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করেছে। ১০ ধরনের প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ ডোজ টিকা কেনার জন্য বিপুল অর্থ ছাড় করা হয়েছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলেও আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
এদিকে, ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হামের টিকার সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও উদ্বেগ এখনও কাটেনি। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে আরও সাত শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
পাঠকের মন্তব্য