
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক:
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
ভোটগ্রহণ শেষে জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষেই প্রকাশ্যে ভোট গণনা করা হয়। গণনা শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিজয়ী ঘোষণা করেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যুক্ত হলো নতুন এক অধ্যায়। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করা এই রাজনীতিক ছাত্ররাজনীতি, সরকারি চাকরি, স্থানীয় সরকার, জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিত্ব এবং বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হলেন।
ছাত্ররাজনীতি থেকে শিক্ষকতা
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি সংগঠনটির এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্বে ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সে সময় তাঁকে গ্রেপ্তারও হতে হয়েছিল।
শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মির্জা ফখরুল। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। এরপর সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস. এ. বারীর একান্ত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে ফিরে আসা
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি।
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিতে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। ১৯৯২ সালে তাঁকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। এরপর দলের বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করে ধীরে ধীরে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন তিনি।
২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান। এর আগে ও পরে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন মির্জা ফখরুল। ওই নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হন তিনি।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালের নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হলেও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব
২০১১ সালের ২০ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। প্রায় পাঁচ বছর এই দায়িত্ব পালনের সময় তিনি বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।
২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির মহাসচিব হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি দলটির শীর্ষ সাংগঠনিক দায়িত্বে ছিলেন।
খালেদা জিয়ার কারাবাস ও অসুস্থতার সময় এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের লন্ডনে অবস্থানের সময়ে দেশে থেকে বিএনপির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।
রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণও করেছেন মির্জা ফখরুল। ২০২২ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৩ সালের অক্টোবরেও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি সময় বিরোধী দলের কর্মসূচি ও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নতুন অধ্যায়
রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর গত ১৩ আগস্ট বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও মহাসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এরপর বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে ২৫৫ ভোট পেয়ে তিনি বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ায় তাঁর বিজয় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবন
ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। তাঁদের দুই কন্যা—মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ।
মির্জা ফখরুলের বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং ঢাকার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
শিক্ষকতা দিয়ে যে কর্মজীবনের শুরু, তা পেরিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে পৌরসভার চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, বিএনপি মহাসচিব—দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তাঁর এই অভিষেক তাঁর রাজনৈতিক জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
পাঠকের মন্তব্য