![]()
ইবি রিপোর্ট
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও লক্ষ্য নির্ধারণ আরও কার্যকর করা গেলে বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমানোর সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একাধিক খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি একত্রিত করা এবং বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণের সঙ্গে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ যুক্ত করা হলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ’ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলেছে, সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ সুফল পেতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে আরও সুনির্দিষ্টভাবে পৌঁছানো প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির সাম্প্রতিক পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে। এতে ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩.৪ শতাংশ করা হয়েছে। বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়া, রপ্তানি দুর্বল হওয়া এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
এর ফলে সাধারণ পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে। আর্থিক খাতের দুর্বলতা ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলছে। সীমিত রাজস্ব সংস্থানের কারণে সরকারি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির কারণে দেশের বহিঃখাত তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
সংস্কারের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি বাড়ার সম্ভাবনা
জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের গতি বাড়লে ২০২৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে আশা করছে বিশ্বব্যাংক।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যাঁ পেসম বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ-চালিত অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দরিদ্রদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আরও বেশি ও উন্নত কর্মসংস্থান তৈরিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার দ্রুত করতে হবে।
দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে দেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। একই সময়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি থমকে গেছে এবং বিপুল সংখ্যক নারী চাকরি হারিয়েছেন।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও বেড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০.৬ শতাংশ থেকে খেলাপি ঋণের হার ২০২৬ সালের জুনে বেড়ে ৩৩.২ শতাংশ হয়েছে। এদিকে রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮.৩ শতাংশ, যা বিশ্বজুড়ে অন্যতম সর্বনিম্ন হার। ফলে প্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় সংকুচিত হচ্ছে। ২০২৫ অর্থবছরের ৩.৫ শতাংশ থেকে রাজস্ব ঘাটতি ২০২৬ অর্থবছরে বেড়ে জিডিপির ৩.৯ শতাংশ হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষায় লক্ষ্য নির্ধারণের ওপর জোর
সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করলেও সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই।
বিশ্বব্যাংকের মতে, উপকারভোগী নির্বাচনে উন্নত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে এসব কর্মসূচির দারিদ্র্য কমানোর প্রভাব বাড়ানো সম্ভব। সরকারের ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণ এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
এদিকে প্রতিবেদনটিতে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছে। শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে এ বছর দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬.৯ শতাংশ হতে পারে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে ২০২৭ সালে তা কমে ৬.৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শ্রম উৎপাদনশীলতা, রপ্তানি বৈচিত্র্য ও জনসেবার মান বাড়াতে পারে। তবে এর সুফল পেতে দক্ষতা, অবকাঠামো ও সহায়ক কর্মপরিবেশে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।