![]()
ইবি রিপোর্ট
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দিয়েছে জাতিসংঘ। বাড়তি এই সময়কে কাজে লাগাতে বাংলাদেশকে বাণিজ্য নীতি সংস্কার, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাজস্ব আয় বাড়ানো, বন্দর ও লজিস্টিকস অবকাঠামো আধুনিকায়ন এবং শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বড় অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।
তাদের পরামর্শ, বাড়তি সময়কে স্বস্তির সুযোগ হিসেবে না দেখে ছয়টি খাতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে তিন বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ, এলডিসি হিসেবে পাওয়া শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা উঠে গেলে দেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ল
গত ৩০ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করে। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) সুপারিশের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে বাংলাদেশ জোরালো পদক্ষেপ নেবে—এমন প্রত্যাশা থেকেই বাড়তি সময় দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশ আসে এলডিসি হিসেবে পাওয়া শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধাসহ বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য ব্যবস্থার আওতায়। এসব সুবিধা বন্ধ হলে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্প সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে।
পরিকল্পনা আছে, প্রয়োজন বাস্তবায়ন
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকার ইতিমধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস) তৈরি করেছে। এতে নির্দিষ্ট সময়সীমাসহ ১৫০টি করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে তাঁর মতে, মূল সমস্যা পরিকল্পনার অভাব নয়, বরং বাস্তবায়নের দুর্বলতা। বিদ্যমান কৌশলপত্রকে সংক্ষিপ্ত করে আগামী তিন বছরের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্যমাত্রা, সময়সীমা ও অগ্রগতি পরিমাপের সূচক প্রকাশ করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক বলেন, শুধু সময় বাড়লেই প্রস্তুতি নিশ্চিত হবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বাণিজ্য সুবিধা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আগেভাগেই আলোচনা শুরু করা জরুরি। একই সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) আলোচনা দ্রুত শুরু করতে হবে। তাঁর মতে, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া বাড়তি সময় কাজে লাগানো কঠিন হবে।
মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দক্ষতা, বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতানির্ভর অর্থনৈতিক মডেলে যেতে হবে বাংলাদেশকে।
ব্যবসায়ীদের ছয় অগ্রাধিকার
ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, এলডিসি উত্তরণের জন্য এতদিন বিশেষ কোনো প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। এখন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। শুল্কমুক্ত সুবিধা শেষ হলে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করতে হবে।
এ জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, বন্দর ও লজিস্টিকস সেবার উন্নয়ন এবং সুদের হার কমানোর ওপর জোর দেন তিনি।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী নিয়মিত তিন বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশ কার্যত ছয় বছর সময় পাবে। এরপর আর সময় বাড়ানোর সুযোগ থাকবে না।
তাৎক্ষণিক করণীয় হিসেবে তিনি প্রধান বাজারগুলোর সঙ্গে এফটিএ সই, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, কারখানায় অটোমেশন চালু এবং গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ শেষ করার কথা বলেন।
সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি প্রধান বাণিজ্য জোটগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে মাহমুদ হাসান খান বলেন, বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণে এগিয়ে আসতে হবে। যারা তা করতে পারবেন না, তারা প্রতিযোগিতার বাজারে পিছিয়ে পড়বেন।
রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো
এলডিসি উত্তরণের পর শুল্ক সুবিধা হারানোর পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে পেটেন্ট লাইসেন্সিং ফি এবং বিভিন্ন কমপ্লায়েন্স ব্যয় বাড়তে পারে। এসব চাপ সামলাতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ, ব্যবসার খরচ কমানো, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওয়ার্ক পারমিট প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বাণিজ্যিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির পরামর্শ দিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, বাংলাদেশের অতীতের নীতিগুলো মূলত তৈরি পোশাকশিল্পের অনুকূলে ছিল। ফলে অন্যান্য খাত তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা পায়নি। তাঁর মতে, উচ্চ সম্ভাবনাময় কয়েকটি খাত বেছে নিয়ে সেগুলোর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা তৈরিতে সীমিত সম্পদ কাজে লাগাতে হবে। উদ্ভাবনী উদ্যোগে সরকারি অর্থায়নও নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে দেওয়া উচিত।
আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন রপ্তানি খাত গড়ে তুলতে আধুনিক প্রযুক্তি, মান পরীক্ষার সুবিধা, গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল, দক্ষ শ্রমশক্তি, স্বল্প সুদের অর্থায়ন এবং বিদেশে বিপণন নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করতে হবে। এ উদ্যোগ শুধু তৈরি পোশাক ও ওষুধশিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।
শিল্প খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে উৎপাদনকারীদের অটোমেশন ও প্রযুক্তি ব্যবহারে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
রাজস্ব ও ব্যাংক খাতেও সংস্কার প্রয়োজন
এলডিসি উত্তরণের পর উন্নয়ন অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক ঋণের শর্তে পরিবর্তন আসতে পারে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে পাওয়া কিছু বিশেষ সুবিধা ও সহজ শর্তের অর্থায়নের সুযোগও কমবে। এ পরিস্থিতিতে অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অর্থায়ন অব্যাহত রাখতে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর প্রয়োজন হবে।
এ জন্য করের আওতা সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং কর ফাঁকি রোধ করতে হবে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যাংক খাতে সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা উঠে যাওয়ার পরও বেসরকারি বিনিয়োগ ধরে রাখতে হলে টেকসই আর্থিক খাত ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।