
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, আন্দোলন-সংগ্রাম ও নানা চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে জনগণের ভোটে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, এখন বিএনপি ও সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনগণের আস্থা ও জনপ্রিয়তা ধরে রাখা। এজন্য জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত থাকার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে দলের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন ও দোয়া শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন রিজভী।
জিয়ার আদর্শেই বিএনপির পথচলা
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রসঙ্গ তুলে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ৪৮ বছর আগে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কয়েকটি মৌলিক প্রত্যয় সামনে রেখে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন।
রিজভীর ভাষ্য, বিএনপি সেই নীতি, আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শনকে ধারণ করেই এগিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বৈদেশিক নীতি, অভ্যন্তরীণ নীতি ও আইনশৃঙ্খলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বিএনপি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নাগরিক স্বাধীনতা এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক মত প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ
রিজভী বলেন, ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে দেশে সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় শহীদ জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
বিদেশে শ্রমশক্তি রপ্তানি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতেও জিয়াউর রহমানের অবদান রয়েছে বলে উল্লেখ করেন বিএনপির এই নেতা।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ভূমিকা
এরশাদবিরোধী আন্দোলনের কথা তুলে ধরে রিজভী বলেন, বিভিন্ন ষড়যন্ত্র ও রাজনৈতিক চক্রান্তের মাধ্যমে দেশে আবারও গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ সংকুচিত হয়ে পড়েছিল।
তার বিরুদ্ধে বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ নয় বছর আপসহীন আন্দোলন করেছেন উল্লেখ করে রিজভী বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে তিনি কোনো আপস করেননি এবং জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার রক্ষা করেছেন।
বিএনপিকে ‘ওয়াদা রক্ষাকারী দল’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নানা ধরনের নিপীড়ন, নির্যাতন ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও খালেদা জিয়া দল ও দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মধ্যেও তিনি জনগণের বিজয় ও গণতন্ত্রের বিজয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করেছেন।
তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা
রিজভী বলেন, দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকা অবস্থায়ও খালেদা জিয়া রাজনৈতিক সংগ্রাম থেকে সরে যাননি। তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের দায়িত্ব পালন করেছেন তার জ্যেষ্ঠ পুত্র ও বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, তারেক রহমান তাঁর পিতা-মাতার রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত দল ও জনগণকে সংগঠিত করেছেন।
রিজভীর দাবি, তারেক রহমানের নেতৃত্বে ২০১৮ সাল থেকে শুরু হওয়া গণআন্দোলন পরবর্তী সময়ে জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আরও বিস্তৃত রূপ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
খালেদা জিয়াকে গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দেশের মানুষকে গণতান্ত্রিক সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তাঁর সাহস, আদর্শ ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের চেতনা এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
জনগণের আস্থা ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ
বর্তমান সরকারের কার্যক্রম প্রসঙ্গে রুহুল কবির রিজভী বলেন, জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তারেক রহমান কাজ করে যাচ্ছেন। সরকারের সামনে নানা চ্যালেঞ্জ ও ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। তবে এসব মোকাবিলা করে সরকার সামাজিক সুরক্ষা, উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসা বিএনপির জন্য এখন দায়িত্ব আরও বেড়েছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে রাজনৈতিকভাবে আস্থা ধরে রাখা কঠিন হবে। তাই নির্বাচনী ইশতেহার ও জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট বৈশ্বিক: রিজভী
দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়েও কথা বলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। তিনি বলেন, এই সংকট শুধু বাংলাদেশ বা সরকারের একক সমস্যা নয়; এর সঙ্গে বৈশ্বিক পরিস্থিতিও জড়িত।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা এবং জ্বালানি পরিবহনকারী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
রিজভী বলেন, সরকার সংকট মোকাবিলায় নিষ্ক্রিয় নেই। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দের বাইরে আরও প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মহেশখালীর একটি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি মেরামতের পর পুনরায় গ্যাস রিগ্যাসিফিকেশন শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সেপ্টেম্বরের প্রথম অথবা দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে দেশে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
৩১ দফা ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অঙ্গীকার তুলে ধরে রিজভী বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে গণতান্ত্রিক চেতনা গড়ে উঠেছে, তা ধরে রাখতে হবে।
জনগণের সামাজিক সুরক্ষা, দেশের উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধির যে প্রতিশ্রুতি বিএনপির ৩১ দফা, নির্বাচনী ইশতেহার এবং বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০-এ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করাই এখন দলের প্রধান লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে দলটি তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস স্মরণ করার পাশাপাশি নতুন সরকারের সামনে থাকা দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেছে। এখন জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করা যায় এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হয়—সেটিই বিএনপির রাজনৈতিক সাফল্যের অন্যতম বড় পরীক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য