
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা থেকে সরে গেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে লড়াই করার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা কানাডার নেই।
সোমবার (৩১ আগস্ট) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার অর্থনীতির আকারের পার্থক্য তুলে ধরে বলেন, নিজের চেয়ে প্রায় ১৩ গুণ বড় একটি দেশের সঙ্গে টক্কর দেওয়া কানাডার পক্ষে সম্ভব নয়।
বেসেন্টের এই মন্তব্য এসেছে দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যেই। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্যের ওপর কানাডা সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে। এর আগে বাণিজ্য আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর কানাডার পণ্যের ওপর কঠোর শুল্ক আরোপ করেছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
কার্নির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক স্বার্থে চুক্তি ছাড়ার অভিযোগ
মার্কিন অর্থমন্ত্রী অভিযোগ করেন, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি রাজনৈতিক বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির পথ থেকে সরে গেছেন। তাঁর দাবি, ট্রাম্পবিরোধী অবস্থানকে সামনে রেখেই রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন কার্নি।
বেসেন্ট বলেন, বাণিজ্য ইস্যুটিকে কার্নি অর্থনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে একটি ‘রাজনৈতিক চিৎকারের লড়াইয়ে’ পরিণত করেছেন।
তবে কানাডার পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগের বিপরীতে বলা হয়েছে, দেশটি কোনো খারাপ বা অসম বাণিজ্য চুক্তি মেনে নেবে না। কানাডার অর্থ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জন ফ্রাগোস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব না হওয়া দুঃখজনক। তবে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো চুক্তি কানাডা গ্রহণ করবে না।
‘১৩ গুণ বড় দেশের সঙ্গে টক্কর দেওয়া সম্ভব নয়’
সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার অর্থনৈতিক সক্ষমতার তুলনা করে বেসেন্ট বলেন, কানাডা তার চেয়ে প্রায় ১৩ গুণ বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যযুদ্ধে টিকে থাকার অবস্থানে নেই।
তিনি আরও বলেন, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে কোনো সামরিক যুদ্ধ চলছে না। তবে পরিস্থিতি যদি সত্যিকারের সংঘাতে রূপ নেয়, সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই করার মতো সক্ষমতা কানাডার নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনাকে ব্যঙ্গ করে বেসেন্ট কানাডার সামরিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি এডমন্টনের একটি শপিং মলে থাকা পুরোনো আকর্ষণের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, কানাডা যেন দুটি সাবমেরিন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে—এমনই একটি ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেন তিনি।
পাল্টা শুল্কে কঠোর অবস্থান কানাডার
বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে শুল্ক নিয়ে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার বিভিন্ন পণ্যের ওপর কঠোর শুল্ক আরোপের পর কানাডাও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে।
কানাডার অর্থ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জন ফ্রাগোস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি না হওয়াটা দুঃখজনক হলেও কানাডার স্বার্থ রক্ষা করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, প্রচলিত ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ পটাশসহ কানাডার হাতে এমন অনেক সম্পদ রয়েছে, যেগুলোর বৈশ্বিক চাহিদা রয়েছে।
ফলে বাণিজ্য আলোচনায় কানাডারও গুরুত্বপূর্ণ কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা রয়েছে বলে দেশটির পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য উত্তেজনা
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে। দুই দেশের সীমান্তপারের বাণিজ্যের পরিমাণ বিপুল হওয়ায় শুল্ক আরোপ ও পাল্টা শুল্কের প্রভাব উভয় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভোক্তা পর্যায়েও পড়তে পারে।
বিশেষ করে জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, কৃষিপণ্য ও শিল্পপণ্যের বাণিজ্য দুই দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে চলমান উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শুধু দুই দেশের সম্পর্কেই নয়, বৃহত্তর উত্তর আমেরিকার সরবরাহব্যবস্থাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক প্রভাব ও বাজারের আকারকে আলোচনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, অন্যদিকে কানাডা নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৌশলগত বাণিজ্যিক গুরুত্বকে সামনে রেখে অবস্থান শক্ত করছে।
ফলে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দুই দেশের টানাপোড়েন শিগগিরই মিটবে, নাকি শুল্কযুদ্ধ আরও তীব্র হবে—সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অঙ্গনের।
পাঠকের মন্তব্য