
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংক একীভূত করে গঠিত রাষ্ট্রমালিকানাধীন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য কৌশলগত অংশীদার খুঁজছে সরকার। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন মুসলিম দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে কাতারকে ব্যাংকটিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কৌশলগত অংশীদার হওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ।
সম্প্রতি কাতার সফরের সময় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর দেশটির কাছে এই প্রস্তাব দেন। কাতারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।
টিবিএসকে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, কাতারকে ইতিমধ্যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কৌশলগত অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
তিনি জানান, কাতারের সঙ্গে আরও আলোচনা হবে। পাশাপাশি অন্যান্য মুসলিম দেশ ও সংস্থাকেও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কৌশলগত অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
কেন বিদেশি কৌশলগত অংশীদার খুঁজছে সরকার
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ এবং ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার প্রয়োজন থেকেই বিদেশি কৌশলগত অংশীদার আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে আগে নেওয়া ‘হেয়ারকাট’ সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে এবং আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে মূলত দুটি পথ রয়েছে। একটি হলো সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ সরবরাহ করা। অন্যটি হলো বিদেশি কোনো রাষ্ট্র বা সংস্থাকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ব্যাংকের মালিকানায় নিয়ে আসা।
এই কারণেই মুসলিম দেশ ও সংস্থাগুলোকে ব্যাংকটিতে কৌশলগত বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কৌশলগত অংশীদার কী করবে
ব্যাংকের কৌশলগত অংশীদার কেবল অর্থ বিনিয়োগকারী হিসেবে কাজ করে না। দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের ব্যবসা সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো, পরিচালনব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা থাকে।
সাধারণ শেয়ারহোল্ডারের তুলনায় কৌশলগত অংশীদাররা ব্যাংকের পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ধরনের অংশীদার সাধারণত বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি তহবিল বা ইক্যুইটি বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকের মূলধনভিত্তি শক্তিশালী করে। একই সঙ্গে সংকটের সময়ে আর্থিক সহায়তা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির স্থিতিশীলতা ধরে রাখতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
ফলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য একজন শক্তিশালী বিদেশি কৌশলগত অংশীদার পাওয়া গেলে আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের পাশাপাশি ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রমকে স্থিতিশীল করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এফডিআরের টাকা একসঙ্গে তোলা যাবে, তবে মুনাফা নয়
এদিকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং রেগুলেশন ডিপার্টমেন্টের সাম্প্রতিক সার্কুলার অনুযায়ী, ব্যাংকটির গ্রাহকেরা তাদের ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্ট বা এফডিআরে থাকা মূল অর্থ একসঙ্গে তুলতে পারবেন।
তবে এ ক্ষেত্রে মুনাফা পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
এফডিআরধারীরা যদি মুনাফা পেতে চান, তাহলে তাদের ব্যাংক রেজল্যুশন স্কিমের আওতায় থাকতে হবে।
অন্যদিকে কারেন্ট ও সেভিংস অ্যাকাউন্টের আমানতকারীরা নির্ধারিত ব্যবস্থার আওতায় একবারে মূল টাকা তুলতে পারবেন এবং প্রযোজ্য মুনাফাও পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
৭ সেপ্টেম্বর থেকে আমানত ফেরত
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তি হিসাবের গ্রাহকদের মূল আমানতের অর্থ ফেরত দেওয়া শুরু হবে ৭ সেপ্টেম্বর থেকে।
প্রাথমিকভাবে গ্রাহকেরা তাদের হিসাবে জমা থাকা সম্পূর্ণ মূল অর্থ এককালীন উত্তোলন বা নগদায়ন করতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে মুনাফা পাওয়া যাবে না।
এ জন্য ব্যাংকটির শাখাগুলোতে ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু করার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর থেকেই ব্যক্তি হিসাবের স্বাভাবিক লেনদেন পুনরায় চালুর কথা রয়েছে। তবে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার আগে ব্যাংকের শাখা ও উপশাখাগুলোতে প্রয়োজনীয় নগদ অর্থের ব্যবস্থা করতে সময় প্রয়োজন।
শাখা ও উপশাখা থেকে নগদ অর্থের চাহিদাপত্র পাঠানো, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় নগদ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ নগদ ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে কয়েক দিন সময় লাগবে। এ কারণে ৭ সেপ্টেম্বর থেকে পুরোদমে আমানতের মূল অর্থ ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কীভাবে গঠিত হলো সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক
এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক এবং আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রিত এক্সিম ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে ছিল।
বিশেষ করে অনিয়ম, দুর্নীতি, ঋণ অনিয়ম এবং বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হচ্ছিল।
পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করে। নতুন ব্যাংকটি শতভাগ সরকারি মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে।
একীভূতকরণের মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকগুলোর আমানতকারী ও গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
৭৬ লাখ আমানতকারীর অর্থ রয়েছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর মোট ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে।
এর মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের সঞ্চয়ী হিসাবে জমা রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে পাঁচটি ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৮৬ শতাংশই খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।
ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতিও অত্যন্ত বড়। মোট মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ অবস্থায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। শুধু আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়াই নয়, ব্যাংকের মূলধন শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যতে ঋণ কার্যক্রম স্বাভাবিক করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
৩৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন
সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক হিসেবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গত বছরের নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।
ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
পরিশোধিত মূলধনের ২০ হাজার কোটি টাকা সরকার সরবরাহ করেছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার হিসেবে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ব্যবস্থার মাধ্যমে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি ব্যাংকের মালিকানার কাঠামোতেও তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদেশি অংশীদার পেলে কী পরিবর্তন আসতে পারে
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য বিদেশি কৌশলগত অংশীদার পাওয়া গেলে ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে আধুনিক ব্যাংকিং প্রযুক্তি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং আন্তর্জাতিক ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বিদেশি কোনো রাষ্ট্র বা সংস্থাকে কৌশলগত অংশীদার করার ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পরিমাণ, মালিকানার কাঠামো, পরিচালনা পর্ষদে অংশগ্রহণ এবং বিনিয়োগের শর্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বিপুল খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতির মধ্যে থাকা ব্যাংকটিকে দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক ও টেকসই প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।
সরকার এখন কাতারের পাশাপাশি অন্যান্য মুসলিম দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছেও বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। ফলে আগামী দিনে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালন কাঠামোয় বিদেশি কৌশলগত অংশীদারের উপস্থিতি তৈরি হয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
পাঠকের মন্তব্য