
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
আজ ১ সেপ্টেম্বর। বিশ্ব ইতিহাসের নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, জন্ম ও মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই দিনটি। তবে ১৯৮৫ সালের এই দিনটি বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরে ঐতিহাসিক জাহাজ টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কারের কারণে।
১৯১২ সালে উত্তর আটলান্টিকে ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ডুবে যাওয়া বিলাসবহুল যাত্রীবাহী জাহাজ টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাওয়া যায় দীর্ঘ ৭৩ বছর পর, ১৯৮৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর। সমুদ্রের হাজার হাজার ফুট নিচে হারিয়ে থাকা জাহাজটির ধ্বংসাবশেষ খুঁজে বের করার ঘটনা সামুদ্রিক ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার ঘটনাটির পেছনে ছিল আরও একটি চমকপ্রদ অধ্যায়। পরে জানা যায়, এর সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি গোপন অভিযানও জড়িত ছিল। ফলে বহু বছর ধরে রহস্যে ঘেরা টাইটানিকের গল্পে নতুন মাত্রা যোগ হয়।
৭৩ বছর পর সমুদ্রের তলায় টাইটানিক
১৯১২ সালের ১৫ এপ্রিল উত্তর আটলান্টিকে বিশাল বরফখণ্ডের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ডুবে যায় টাইটানিক। সে সময় জাহাজটিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও বিলাসবহুল যাত্রীবাহী জাহাজ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
দুর্ঘটনার পর জাহাজটির ধ্বংসাবশেষ কোথায় রয়েছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান চালানো হলেও সুনির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
অবশেষে ১৯৮৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর সমুদ্রের গভীরে টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাওয়া যায়। গবেষক রবার্ট ব্যালার্ড ও ফরাসি সমুদ্রবিজ্ঞানী জ্যাঁ-লুই মিশেল নেতৃত্বাধীন অনুসন্ধান দলের প্রচেষ্টায় ধ্বংসাবশেষটি শনাক্ত করা হয়।
সমুদ্রের তলদেশে পড়ে থাকা জাহাজটির বিভিন্ন অংশের ছবি ধারণ করা হলে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
আবিষ্কারের পেছনে ছিল গোপন অভিযান
টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কারের সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি গোপন মিশনের যোগসূত্র থাকার বিষয়টি পরে সামনে আসে।
শুরুতে অনুসন্ধান অভিযানটির প্রকৃত উদ্দেশ্য ও এর সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনীর সংশ্লিষ্টতার পুরো বিষয়টি প্রকাশ্যে আসেনি। পরে জানা যায়, স্নায়ুযুদ্ধের সময় ডুবে যাওয়া মার্কিন সাবমেরিন ইউএসএস থ্রেশার ও ইউএসএস স্করপিয়নের অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট বিষয় অনুসন্ধানের সঙ্গে এই অভিযানের একটি সম্পর্ক ছিল।
এই গোপন সামরিক অনুসন্ধানের মধ্যেই টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে টাইটানিক আবিষ্কারের ইতিহাস শুধু একটি সামুদ্রিক অনুসন্ধানের ঘটনা নয়, বরং স্নায়ুযুদ্ধের গোপন সামরিক কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়।
১ সেপ্টেম্বরের আরও ঐতিহাসিক ঘটনা
টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কারের পাশাপাশি ইতিহাসে ১ সেপ্টেম্বর আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী।
১৫৩৫ সালে ফরাসি নাবিক ও অভিযাত্রী জ্যাক কার্তিয়ে হোশেলাগা অঞ্চলে পৌঁছান।
১৯২৩ সালে জাপানের টোকিও ও ইয়োকোহামা অঞ্চলে ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ইতিহাসে এটি গ্রেট কান্তো ভূমিকম্প নামে পরিচিত।
১৯৩৯ সালে জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করে। এর মধ্য দিয়ে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়।
১৯৫১ সালে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়।
১৯৬৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে লিবিয়ার রাজা ইদ্রিস ক্ষমতাচ্যুত হন। এর মধ্য দিয়ে দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তন আসে।
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয়।
১৯৭৯ সালে মার্কিন মহাকাশযান ‘পায়োনিয়ার-১১’ প্রথমবারের মতো শনি গ্রহের খুব কাছ দিয়ে অতিক্রম করে। এর মাধ্যমে শনি গ্রহ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের নতুন সুযোগ তৈরি হয়।
আর ১৯৮৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর আবিষ্কৃত হয় টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ।
আজকের দিনে যাদের জন্ম
ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই দিনে জন্মগ্রহণ করেছেন বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি।
১৮৫৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন জার্মান সুরকার এঙ্গেলবার্ট হামপারডিঙ্ক।
১৮৭৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন মার্কিন ঔপন্যাসিক এডগার রাইস বারোজ। ‘টারজান’ চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
১৯০৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন ফরাসি সাহিত্যিক থিওফিল গোতিয়ে।
১৯৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন ভারতের খ্যাতনামা স্থপতি চার্লস কোরিয়া। আধুনিক ভারতীয় স্থাপত্যে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
আজকের দিনে যাদের মৃত্যু
১ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেছেন ইতিহাস ও সংস্কৃতির জগতের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
১৫৫৭ সালে মারা যান ফরাসি নাবিক ও অভিযাত্রী জ্যাক কার্তিয়ে।
১৬৮৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন ইংরেজ লেখক জন বানিয়ান। তার সাহিত্যকর্ম ইংরেজি সাহিত্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৬৩ সালে মারা যান ফরাসি চিত্রশিল্পী জর্জ ব্রাক। আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা কিউবিজমের বিকাশে তার বড় ভূমিকা ছিল।
১৯৬৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন ব্রিটিশ কবি সিগফ্রিড স্যাসুন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও যুদ্ধবিরোধী সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত।
ইতিহাসের পাতায় ১ সেপ্টেম্বর
একই দিনে বিভিন্ন সময় ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা প্রমাণ করে, ক্যালেন্ডারের প্রতিটি তারিখের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে ইতিহাসের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক পরিবর্তন, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এবং ঐতিহাসিক আবিষ্কার—সব মিলিয়ে ১ সেপ্টেম্বরও বিশ্ব ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য দিন।
তবে ১৯৮৫ সালের এই দিনের টাইটানিক আবিষ্কার আজও বিশেষভাবে আলোচিত। কারণ ৭৩ বছর সমুদ্রের অন্ধকারে হারিয়ে থাকার পর বিশ্বের অন্যতম আলোচিত জাহাজটির ধ্বংসাবশেষের সন্ধান শুধু একটি দীর্ঘ অনুসন্ধানের সফলতাই ছিল না, বরং এর নেপথ্যে থাকা গোপন সামরিক অভিযানের তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে ঘটনাটি পেয়েছিল আরও গভীর ঐতিহাসিক তাৎপর্য।
পাঠকের মন্তব্য