![]()
ইবি রিপোর্ট
দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ ও কারখানার উৎপাদন বন্ধের ঘটনা বিদেশি ক্রেতাদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় কয়েকটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। চলমান অচলাবস্থা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে না পারলে বাংলাদেশ থেকে ক্রয়াদেশ কমিয়ে অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা করছেন রপ্তানিকারকরা।
কারখানা মালিক ও বিদেশি ক্রেতাদের প্রতিনিধিরা টিবিএসকে জানান, উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় ক্রেতারা উদ্বিগ্ন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পোশাক প্রস্তুত ও সরবরাহ করা সম্ভব হবে কি না, তা জানতে বিভিন্ন কারখানার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন তারা।
বাংলাদেশ থেকে তিন দশকের বেশি সময় ধরে পোশাক কিনছে সুইডেনভিত্তিক একটি বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির ঢাকা কার্যালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে আগামী দুই মাসের জন্য বাংলাদেশ থেকে ক্রয়াদেশ কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে তাদের প্রতিষ্ঠান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এই সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমাদের পক্ষ থেকে তেমন সমস্যা নেই। তবে এটি যদি দীর্ঘায়িত হয়, সেক্ষেত্রে পরবর্তী দুই মাসের জন্য ক্রয়াদেশ কমিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।’
অন্য এক ক্রেতা প্রতিনিধি জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য পোশাক তৈরি করে এমন কয়েকটি কারখানায় ইতিমধ্যে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘চালু রাখা কারখানায় অন্য কারখানার শ্রমিকরা এসে হামলা করছে বলে শুনেছি।’
তিনি আরও জানান, আরেকটি ব্র্যান্ডের নিয়মিত সরবরাহকারী কারখানাগুলোও চলমান অচলাবস্থার কারণে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
ফেব্রিকা নিট কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, পণ্য সরবরাহে বিলম্ব হওয়ায় বিদেশি ক্রেতারা ইতিমধ্যে অসন্তোষ জানাতে শুরু করেছেন।
টিবিএসকে তিনি বলেন, ‘সঠিক সময়ে উৎপাদন করতে না পারায় শিপমেন্টের সময় বাড়ানোর জন্য বলা হলে ক্রেতা অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু ক্রেতা নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়া বন্ধ রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। এরই মধ্যে ধাপে ধাপে কিছু ক্রয়াদেশ ভারত, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে।
মিজানুর রহমান বলেন, জ্বালানি সংকট, মজুরি বৃদ্ধির চাপ এবং ক্রয়াদেশের ঘাটতির কারণে পোশাক শিল্প আগে থেকেই চাপে রয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে ক্রয়াদেশ বাতিল বা কমে গেলে আসন্ন রমজান ও ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন এবং উৎসব বোনাস পরিশোধ করা কারখানাগুলোর জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তিনি আরও জানান, চলমান আন্দোলন শুধু ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে হচ্ছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা নিয়েও বিদেশি ক্রেতারা জানতে চাইছেন।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহসভাপতি শেহাব উদ্দোজা বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কতদিন লাগতে পারে, তা জানতে সোমবার একজন ক্রেতা প্রতিনিধি তার কারখানায় যোগাযোগ করেছেন।
টিবিএসকে তিনি বলেন, ‘আমরা আশঙ্কা করছি, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বাংলাদেশ ক্রয়াদেশ হারাবে।’
বর্তমানে পোশাক শ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা প্রায় ১০০ ডলারের সমান। শ্রমিক প্রতিনিধিরা প্রায় এক মাস ধরে এই মজুরি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়ে আসছেন। পাশাপাশি দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠনের জন্য সরকারের প্রতি চাপ দিচ্ছেন তারা।
শ্রমিকরা কাজে যোগ না দেওয়ায় রোববার ৫০০টিরও বেশি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হন মালিকরা। ওই দিন সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করায় সোমবার কারখানাগুলোতে উৎপাদন স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। তবে বাস্তবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
সোমবার শ্রমিকদের কাজে না ফেরা এবং হামলার আশঙ্কায় মালিকপক্ষ প্রায় ৭০০ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখে। এতে নির্ধারিত সময়ে পণ্য প্রস্তুত ও জাহাজীকরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণ সম্ভব না হলে রপ্তানিকারকদের উড়োজাহাজে পণ্য পাঠানোর প্রয়োজন হতে পারে। এতে স্বাভাবিক পরিবহন ব্যয়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি খরচ হবে। খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নির্ধারিত সময়ে পণ্য না পেলে বিদেশি ক্রেতারা ডিসকাউন্ট দাবি করতে পারেন, এমনকি পুরো ক্রয়াদেশ বাতিলও করতে পারেন।