![]()
ইবি রিপোর্ট
রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্যে জ্বালানি তেল বিক্রির পর্যায়ে আবগারি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে নতুন এ কর আরোপের সময় এখন নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের আশঙ্কা, এতে মানুষের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বিনিয়োগের গতিও কমতে পারে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সভায় আইএমএফের প্রতিনিধি দল এ প্রস্তাব দেয় বলে জানিয়েছেন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে নতুন করে ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে আলোচনা করছে সংস্থাটি। সেই আলোচনার অংশ হিসেবে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে বর্তমানে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করছে।
এনবিআর কর্মকর্তারা আইএমএফের প্রতিনিধিদলকে জানিয়েছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন কোনো কর আরোপ করা হলে জনঅসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সভায় উপস্থিত একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, ‘আমরা প্রতিনিধিদলকে জানিয়েছি, তাদের প্রস্তাবটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। কারণ এনবিআর এককভাবে এ ধরনের সংবেদনশীল নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।’
বর্তমানে জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে সব মিলিয়ে ৩০ শতাংশের বেশি আমদানি কর রয়েছে। তবে বিক্রির পর্যায়ে সরকার ভর্তুকি দেওয়ায় বাজারে কম দামে জ্বালানি বিক্রি হয়। ফলে এ খাত থেকে এনবিআর ভ্যাট আদায় করতে পারে না।
আইএমএফের মতে, যাদের ভ্যাট দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে, তাদের কাছে সরকারের ভর্তুকির অর্থ পৌঁছানো উচিত নয়। এ কারণেই বিক্রির পর্যায়ে একটি নির্দিষ্ট হারে আবগারি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।
মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে ভর্তুকি পৌঁছানো নিশ্চিত করে ভর্তুকির পরিমাণ কমানোর পেছনে যৌক্তিক কারণ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘কিন্তু ইকোসিস্টেম ঠিক না করে হঠাৎ করেই জ্বালানির উপর নতুন করে কর আরোপ হলে তা সব ধরনের মানুষকে আঘাত করবে, বিনিয়োগের গতি আরও মন্থর হবে এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’
সিপিডির আরেক ডিস্টিংগুইশড ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সংস্কার প্রয়োজন হলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর জন্য এটি উপযুক্ত সময় নয়।
তিনি আরও বলেন, ‘এতে মানুষের খরচ বেড়ে যাবে।’
প্রস্তাবের বিরোধিতা এনবিআরের
প্রস্তাবিত আবগারি শুল্ক কীভাবে কার্যকর হতে পারে, জানতে চাইলে এনবিআর সদস্য সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বলেন, আমদানি পর্যায়ে বিদ্যমান করের পাশাপাশি প্রতি লিটার তেল বিক্রির ওপর নির্দিষ্ট অঙ্কের শুল্ক বসানো হতে পারে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, যে পরিমাণ শুল্ক আরোপ করা হবে, খুচরা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের দাম একই পরিমাণে বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ভোক্তাদের ওপর।
এনবিআরের আরেক কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে সংস্থাটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আইএমএফের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। তার মতে, নতুন আরেকটি কর আরোপ করা হলে মানুষের মধ্যে আবারও অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
ওই কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, ‘বর্তমানে মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে রয়েছে। ফলে নতুন করে এ ধরনের কর আরোপ করা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত হবে, সে সিদ্ধান্ত সরকারকে নিতে হবে।’
তবে সরকার এ প্রস্তাবে সম্মতি দিলে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কর অব্যাহতি দ্রুত প্রত্যাহার চায় আইএমএফ
এনবিআরের পক্ষ থেকে আইএমএফের প্রতিনিধি দলকে জানানো হয়েছে, ধাপে ধাপে ২০৩০ সালের মধ্যে বেশিরভাগ ভ্যাট ও কর অব্যাহতি তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এসব অব্যাহতি এখনই কেন প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়, সে বিষয়ে জানতে চেয়েছে আইএমএফ।
একজন কর্মকর্তা জানান, এনবিআরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হঠাৎ করে কর অব্যাহতি তুলে নেওয়া হলে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের দেওয়া পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতিও ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকার নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর অব্যাহতি দিয়েছে। সেই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই ব্যবসায়ীরা তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা তৈরি করেছেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এমন অবস্থায় হুট করে সব অব্যাহতি তুলে কর বা ভ্যাট আরোপ করা যৌক্তিক হবে না।’