
ইবি রিপোর্ট
তিন দশক ধরে জনমিতিক লভ্যাংশ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার বড় একটি অংশ এখন কর্মক্ষম বয়সী। তবে একই সঙ্গে দ্রুত বাড়ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও। ফলে একদিকে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সুযোগ কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তা যেমন রয়েছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়েও এখন থেকেই কার্যকর প্রস্তুতির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
ইউএনএফপিএর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১১ কোটি ৪২ লাখ মানুষ বা মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ কর্মক্ষম। বিপরীতে বর্তমানে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ বর্তমানে দেশের প্রতি ১০ জনে প্রায় একজন প্রবীণ।
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার ৬৮ বছর বয়সী তৈয়ব আলীর জীবন এ পরিবর্তনের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তিনি দীর্ঘ ৩২ বছর সরকারি চাকরি করেছেন এবং ২০১৯ সালে অবসরে যান। অবসরের পর কয়েক বছর ছেলেমেয়েদের সঙ্গে থাকলেও প্রায় দেড় বছর আগে তাকে একটি প্রবীণ পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখা হয়।
তৈয়ব আলীর পাঁচ ছেলেমেয়েই চাকরিজীবী। তারা মাসে এক-দুবার বাবাকে দেখতে আসেন এবং কিছু অর্থ দিয়ে যান। সেই অর্থ দিয়েই পুনর্বাসন কেন্দ্রের খরচসহ তার অন্যান্য প্রয়োজন মেটে। তবে বয়সজনিত শারীরিক দুর্বলতা, মানসিক অসুস্থতা এবং দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ায় কঠিন সময় পার করছেন তিনি।
তৈয়ব আলীর মতো দেশের অনেক প্রবীণের শেষ আশ্রয় হয়ে উঠছে বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র বা বৃদ্ধাশ্রম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক বাস্তবতা, কর্মজীবী সন্তানদের ব্যস্ততা এবং একাকিত্বের কারণে প্রবীণরা একপর্যায়ে এসব প্রতিষ্ঠানে থাকতে বাধ্য হন।
জনসংখ্যাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস বলছে, আগামী বছরগুলোয় দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়বে। গ্লোবাল এজওয়াচ ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১১ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবীণ হবে। সংখ্যার হিসাবে এ জনগোষ্ঠী প্রায় আড়াই কোটিতে পৌঁছাতে পারে।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংজ্ঞা ও বয়সসীমা নির্ধারণে বিভিন্ন সংস্থার হিসাবেও পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৪’-এ ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের প্রবীণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ওই হিসাবে ২০২৪ সালে দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর হার ছিল ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। ২০১৯ সালে এ হার ছিল ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ।
অন্যদিকে ইউএনএফপিএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের হার ১৩ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ইউনিসেফের ২০২১ সালে প্রকাশিত ‘পেয়িং ফরওয়ার্ড অ্যান্ড ইনভেস্টিং ইন চিলড্রেন নাউ: ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জেস ইন বাংলাদেশ—ট্রেন্ডস অ্যান্ড পলিসি ইমপ্লিকেশনস’ শীর্ষক প্রতিবেদনের পূর্বাভাস আরও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। এতে বলা হয়, ২০২৯ সালে বাংলাদেশ ‘এইজিং সোসাইটি’ বা বয়স্ক সমাজে প্রবেশ করবে। ওই বছর ৬৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর হার ৭ শতাংশে পৌঁছাবে। ২০৪৭ সালে এ হার বেড়ে দাঁড়াবে ১৪ শতাংশে।
অর্থাৎ মাত্র ১৮ বছরের ব্যবধানে ৬৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর অনুপাত দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে সরকারের সোশ্যাল সিকিউরিটি পলিসি সাপোর্ট কর্মসূচির একটি প্রতিবেদনের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৫০ সালে বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ১২ লাখে পৌঁছাতে পারে। সে সময় এ জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৯ শতাংশ হবে।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এভাবে বাড়তে থাকলেও তাদের আবাসন ও সেবার জন্য সরকারি প্রস্তুতি এখনো সীমিত। সরকার আটটি প্রবীণ নিবাস নির্মাণ করলেও সেগুলো এখনো চালু হয়নি। ফলে কার্যকর সরকারি বৃদ্ধাশ্রমের সুযোগ বর্তমানে নেই।
বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাত বিভাগে সাতটি, জেলায় ৫৬টি, উপজেলায় ২৭টি এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে দুটি—সব মিলিয়ে মোট ৯২টি প্রবীণ নিবাস বা বৃদ্ধাশ্রম রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কতজন প্রবীণ বসবাস করছেন, তার কোনো সমন্বিত সরকারি বা বেসরকারি হিসাব নেই। এর বাইরে বেসরকারি উদ্যোগেও আরও কিছু প্রবীণ নিবাস পরিচালিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (সামাজিক নিরাপত্তা) মোশাররফ হোসেন বলেন, সরকারিভাবে আটটি বিভাগে প্রবীণ নিবাস থাকলেও সেগুলো এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। আগামী মাসে সেগুলো চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারিভাবে অনেক বৃদ্ধাশ্রম রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বয়স্কদের জন্য বয়স্ক ভাতাও দেওয়া হচ্ছে।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বার্ধক্যজনিত শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। দেশের কয়েকটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসকদের করা ‘প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্য: বাংলাদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে মানসিক সমস্যার ব্যাপকতা, ধরন, সংশ্লিষ্ট কারণ ও চিকিৎসাসেবার ঘাটতি—একটি দেশব্যাপী খানাভিত্তিক জরিপ’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রবীণদের ২৮ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছেন।
গবেষণায় নারীদের মধ্যে এ হার ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং পুরুষদের মধ্যে ২৫ শতাংশ। প্রবীণদের মধ্যে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ বিষণ্নতা, ৪ দশমিক ৮ শতাংশ উদ্বেগজনিত রোগ, ৩ দশমিক ৮ শতাংশ সোমাটিক সিম্পটম ডিজঅর্ডার এবং ২ দশমিক ৩ শতাংশ নিউরোকগনিটিভ সমস্যায় ভুগছেন। তবে প্রবীণদের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো অপ্রতুল।
শৈলান প্রবীণ নিবাসের প্রতিষ্ঠাতা দিলরুবা কবির মনে করেন, একাকিত্ব ও দুশ্চিন্তার কারণে প্রবীণদের শারীরিক ও মানসিক জটিলতা আরও বাড়ছে। তার মতে, প্রবীণ নিবাসে আসা অনেকের মধ্যেও এ ধরনের সমস্যা দেখা যায়। তাই বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি পর্যায়েও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রবীণদের জন্য আইনি সহায়তার ব্যবস্থাও থাকা দরকার।
অন্যদিকে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা পাওয়ার পর্যায়ে থাকলেও এর পুরো সুফল এখনো কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। কর্মসংস্থানের ঘাটতি, দক্ষতার অভাব এবং বিপুলসংখ্যক তরুণের দীর্ঘদিন বেকার থাকা কিংবা প্রশিক্ষণের বাইরে থাকার কারণে দেশের মানবসম্পদের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ পরিকল্পনা এবং কর্মমুখী শিক্ষার ঘাটতিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বড় অংশকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা না গেলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে। একই সময়ে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীলতার চাপও বাড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, ভবিষ্যতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে প্রবীণ নির্ভরশীলতার হারও বাড়বে। তাই তাদের শুধু নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী হিসেবে না দেখে সুস্থ, সক্রিয় এবং যতটা সম্ভব উৎপাদনশীল রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।
তার মতে, এজন্য স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে জেরিয়াট্রিক কেয়ার বা প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা ও পেনশনের আওতা সম্প্রসারণ প্রয়োজন। শুধু মানুষের আয়ু বাড়ালেই হবে না, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সময়ও বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে প্রবীণদের কর্মক্ষম রাখতে এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে তাদের দক্ষতা খাপ খাওয়াতে প্রয়োজনীয় নীতি গ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। এতে প্রবীণরাও পরিবার ও অর্থনীতিতে অবদান রাখার সুযোগ পাবেন।
বর্তমানে সরকার ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী দুস্থ ব্যক্তিদের বয়স্ক ভাতা দিচ্ছে। ভবিষ্যতে এ কর্মসূচি ধাপে ধাপে সর্বজনীন করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহ্বুব বলেন, বিপুলসংখ্যক প্রবীণকে বয়স্ক ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি আটটি শান্তিনিবাস নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে প্রবীণদের থাকার ব্যবস্থা থাকবে। দেশের ৮৫টি শিশু পরিবারের খালি আসনেও প্রবীণদের থাকার সুযোগ রয়েছে।
তবে প্রবীণদের জন্য আলাদা আবাসন ও সেবা ব্যবস্থা আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে চিকিৎসার চাহিদাও বাড়ে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বয়স্ক ভাতার আওতা ও বরাদ্দও ধীরে ধীরে বাড়ছে। ভাতাভোগীর সংখ্যা ৬ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৭ লাখ করা হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও মানুষের চাহিদা বিবেচনায় ভবিষ্যতে এ কর্মসূচির আওতা আরও বাড়ানোর বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে।
আজ ১ অক্টোবর বিশ্ব প্রবীণ দিবস। প্রবীণদের অবদানের স্বীকৃতি, তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বার্ধক্যকে সমাজের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালন করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য—‘দ্য এজ অব লংজেভিটি: রিথিংকিং সিস্টেমস ফর লংগার লাইভস’।
বাংলাদেশ যখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগের শেষ পর্যায়ে এগোচ্ছে, তখন প্রবীণ জনগোষ্ঠীর দ্রুত বৃদ্ধি ভবিষ্যৎ জনসংখ্যার কাঠামোতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পাশাপাশি প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, আবাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার প্রস্তুতিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাঠকের মন্তব্য