
ইবি রিপোর্ট
বাংলাদেশে বন্য হাতির অস্তিত্ব দিন দিন গুরুতর সংকটের মুখে পড়ছে। আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর সংকুচিত হওয়া, বন উজাড়, খাদ্যসংকট, মানব-হাতি সংঘাতসহ নানা কারণে গত ১০ বছরে দেশে ১৪৬টি হাতির মৃত্যু হয়েছে।
শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পর্যটন ভবনে ‘হাতি সংরক্ষণ: বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু এ তথ্য জানান।
পরিবেশমন্ত্রী বলেন, হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর সংকুচিত হওয়া, বন উজাড়, খাদ্যের সংকট, সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈদ্যুতিক ফাঁদের কারণে দেশে মানব-হাতি সংঘাত ক্রমাগত বাড়ছে। এসব কারণে হাতি ও মানুষের উভয়ের জীবনই ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বন্য হাতি দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু বর্তমানে তাদের অস্তিত্ব গুরুতর সংকটের মুখে রয়েছে।
বাংলাদেশে বন্য হাতির চলাচল প্রধানত শেরপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে বেশি। বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশে আনুমানিক ২৬৮টি হাতি ছিল। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে ১৪৬টি হাতির মৃত্যু হয়েছে।
পরিবেশমন্ত্রী বলেন, মানুষ ও হাতির নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সরকার কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেবে। হাতি সংরক্ষণকে শুধু একটি প্রাণীর সংখ্যা রক্ষার বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। এর সঙ্গে হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর, পরিবেশের ভারসাম্য এবং হাতির সঙ্গে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা ও জীবিকার বিষয়ও জড়িত।
তিনি বলেন, হাতি যখন লোকালয় বা কৃষিজমিতে প্রবেশ করে, তখন মানুষ ও হাতি উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই সংঘাতের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আগেই সংঘাতের ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
এ জন্য হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর রক্ষা, সংঘাতপ্রবণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, আগাম সতর্কতা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে হাতি সংরক্ষণ কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার কথাও বলেন।
পরিবেশমন্ত্রী আরও বলেন, হাতি সংরক্ষণ একটি জটিল কাজ এবং এটি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। বন অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, অবকাঠামো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, সংরক্ষণ সংস্থা, গবেষক ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় হাতি শিকার ও পাচারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। এসব এলাকায় কার্যকর নজরদারি জোরদার করতে বন অধিদপ্তর ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
একই সঙ্গে সীমান্ত সড়কসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়ার সময় হাতির ঐতিহ্যগত চলাচলের পথ বিবেচনায় রাখার আহ্বান জানান পরিবেশমন্ত্রী। বৃহৎ বন্যপ্রাণীর নিরাপদ চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় পারাপারের ব্যবস্থা অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনার পর্যায়েই নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি।
বন্দী হাতির কল্যাণের বিষয়েও গুরুত্ব দেন পরিবেশমন্ত্রী। তিনি বলেন, বন্দী হাতির লাইসেন্স, সংখ্যা ও অবস্থার যথাযথ রেকর্ড সংরক্ষণ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশিক্ষণের নামে হাতিকে শিকলে রাখা, প্রহার ও নির্যাতনের অভিযোগ এবং সার্কাসসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কাজে হাতি ব্যবহারের বিষয়গুলো যথাযথ আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। মানুষের তত্ত্বাবধানে থাকা হাতির জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা এবং দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন সাবেক উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী, পক্ষীবিদ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ আলী রেজা খান এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) শামিমা বেগম।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), আইইউসিএন বাংলাদেশ, ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স, অরণ্যক এবং দীপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশন যৌথভাবে ‘হাতি সংরক্ষণ: বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এ আলোচনা সভার আয়োজন করে।
সভায় আয়োজক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের পাশাপাশি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ও বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, গবেষক, পরিবেশবিদ, সংরক্ষণকর্মী, আইন বিশেষজ্ঞ এবং হাতি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সম্পৃক্ত বিভিন্ন অংশীজন উপস্থিত ছিলেন।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে হাতির অস্তিত্ব রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আবাসস্থল ও করিডোর রক্ষা, মানব-হাতি সংঘাত কমানো, শিকার ও পাচার বন্ধ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণীকে টিকিয়ে রাখার পথ আরও শক্তিশালী হবে।
পাঠকের মন্তব্য