
ইবি রিপোর্ট
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব একসঙ্গে দুই দিক থেকে সামলাতে হচ্ছে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে। একদিকে লোডশেডিংয়ের সময় ডিজেলচালিত জেনারেটর, বয়লার ও বিভিন্ন সহায়ক যন্ত্রপাতি চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে বাড়ছে কারখানার ব্যয়। অন্যদিকে কাঁচামাল পরিবহন এবং তৈরি পোশাক কারখানা থেকে বন্দর ও ডিপোতে পণ্য পাঠানোর খরচও বেড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বেসরকারি অফডকের বাড়তি চার্জ। সব মিলিয়ে পোশাক রপ্তানিকারকদের অভ্যন্তরীণ ব্যয় গড়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।
রপ্তানিকারকদের মতে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু কারখানার উৎপাদন ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। উৎপাদন থেকে শুরু করে পণ্য জাহাজীকরণ পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে খরচ বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
চট্টগ্রামভিত্তিক তৈরি পোশাক কারখানা ইন্ডিপেনডেন্ট অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম আবু তৈয়ব বলেন, লিটারে ২০ টাকা ডিজেলের দাম বাড়ায় পোশাক কারখানাগুলো নতুন চাপের মধ্যে পড়েছে। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ডিজেল ব্যবহার করে উৎপাদন সচল রাখতে হচ্ছে। একই সময়ে ডিজেলের দাম বাড়ায় অফডক, বন্দর ও পরিবহনসহ বিভিন্ন খরচও বেড়েছে। উৎপাদন থেকে জাহাজীকরণ পর্যন্ত মোট ব্যয় এখনও হিসাব করা না হলেও প্রাথমিক হিসাবে তা গড়ে ১০ শতাংশের মতো বাড়তে পারে বলে জানান তিনি।
গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে সরকার ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়। এর পর থেকেই পোশাক শিল্পের সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে বাড়তি খরচের চাপ দেখা দিতে শুরু করে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর দিন, অর্থাৎ ২১ সেপ্টেম্বর, দেশের ২৩টি বেসরকারি অফডকে আমদানি-রপ্তানি কনটেইনার হ্যান্ডলিংসহ সার্বিক চার্জ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোটস অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা)। সংগঠনটির পক্ষ থেকে ডিজেলনির্ভর সেবার জন্য এই বাড়তি চার্জের কথা বলা হলেও রপ্তানিকারকদের অভিযোগ, বাস্তবে বিভিন্ন ধরনের সেবার ওপরই এর প্রভাব পড়ছে।
সাধারণত অফডকগুলো কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য প্যাকেজভিত্তিক ফি নিয়ে থাকে। রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে কনটেইনারে পণ্য তোলা থেকে শুরু করে জাহাজীকরণের জন্য বন্দরে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন কাজের জন্য নির্ধারিত ফি একত্রে নেওয়া হয়। আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রেও বন্দর থেকে অফডকে আনা এবং খালাস পর্যন্ত বিভিন্ন সেবা প্যাকেজের আওতায় দেওয়া হয়।
তথ্য অনুযায়ী, একটি রপ্তানি কনটেইনারের হ্যান্ডলিংয়ে আগে প্যাকেজ ফি ছিল ১২ হাজার টাকা। ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়ানোর পর তা দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ২০০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতিটি রপ্তানি কনটেইনারে অফডক-সংক্রান্ত ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা।
অন্যদিকে আমদানি পণ্যের একটি কনটেইনারের হ্যান্ডলিং ব্যয় আগে ছিল ১৪ হাজার টাকা। নতুন চার্জ কার্যকর হওয়ার পর তা বেড়ে হয়েছে ১৫ হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি আমদানি কনটেইনারে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকা।
শুধু অফডক নয়, সড়ক পরিবহনেও বাড়তি ব্যয় গুনতে হচ্ছে রপ্তানিকারকদের। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিকেরা পরিবহন ভাড়া বাড়ানো শুরু করেছেন। পোশাক রপ্তানিকারকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দূরত্বভেদে প্রতি ট্রিপে পরিবহন ব্যয় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে প্রতি ট্রিপে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা।
পোশাক শিল্পের সরবরাহব্যবস্থায় এ বাড়তি ব্যয়ের প্রভাবকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়লে কারখানার মুনাফায় চাপ তৈরি হবে। একই সঙ্গে পরিবহন ও অন্যান্য লজিস্টিক ব্যয় বেড়ে গেলে রপ্তানি পণ্যের অভ্যন্তরীণ খরচও বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের ব্যয় বৃদ্ধি শিল্পের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
রপ্তানিকারকদের আরেকটি উদ্বেগ বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার নিয়ে। তাদের দাবি, একই পণ্যের জন্য বিদেশি ক্রেতারা একাধিক দেশের সরবরাহকারীর কাছ থেকে দর নেন। দেশের ভেতরে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার কমিয়ে দিতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জাহাজভাড়াসহ বিভিন্ন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত ইতোমধ্যে চাপের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে লিটারে ২০ টাকা জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। তার অভিযোগ, তেলের দাম বাড়ার পর অফডকসহ বিভিন্ন সেবার চার্জ দ্রুত বাড়ানো হয়েছে। এমনকি যেসব খাতে সরাসরি ডিজেল ব্যবহার হয় না, সেসব খাতের চার্জও বাড়ানো হয়েছে।
ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এখন শুধু কারখানার জ্বালানি ব্যয়ের বিষয় হয়ে থাকছে না। উৎপাদন, পরিবহন, অফডক ও পণ্য জাহাজীকরণ—পুরো সরবরাহব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ছে। এই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত রপ্তানিকারকদের ওপর কতটা চাপ তৈরি করে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন এ খাতের উদ্যোক্তাদের প্রধান উদ্বেগ।
পাঠকের মন্তব্য