
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশের চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, জ্বালানি পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার বিরুদ্ধে ১১ দলীয় বিরোধী জোটের লংমার্চকে একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ কর্মসূচি হিসেবে উল্লেখ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি বলেছেন, জনগণের দুর্ভোগ ও কষ্টের কথা তুলে ধরতেই এই লংমার্চের আয়োজন করা হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সকালে পবিত্র ওমরাহ পালন শেষে দেশে ফিরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন আসিফ মাহমুদ। একই দিন নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টেও তিনি লংমার্চের উদ্দেশ্য ও দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
লংমার্চ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এনসিপির এই মুখপাত্র বলেন, এটি একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির গণতান্ত্রিক সক্ষমতা মূলত প্রতিবাদ করার সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে।
তিনি বলেন, লংমার্চের মাধ্যমে জনগণের কষ্ট ও দুর্ভোগের বিষয়গুলো সামনে তুলে ধরতে চায় ১১ দল। এটি শুধু রাজনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতির অংশ নয়; বরং বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের একটি মাধ্যম।
গ্যাস-বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
দেশের বর্তমান তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আসিফ মাহমুদ। তাঁর অভিযোগ, অতিরিক্ত দাম ও বিভিন্ন ধরনের ভুতুড়ে বিল পরিশোধ করার পরও সাধারণ মানুষ পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না।
এতে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, পরিস্থিতি ২০০৫ সালের আগের সময়ের মতো সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে।
আসিফ মাহমুদ বলেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মক্কা প্যাক্ট নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির তাগিদ
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত স্বাধীনতা ও ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন আসিফ মাহমুদ।
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার এ চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটিকে তারা ইতিবাচকভাবে দেখছেন।
তবে কোনো সামরিক বা বাণিজ্যিক চুক্তিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
আসিফ মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশের সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখার দরজা খোলা রেখেই যেকোনো বাণিজ্যিক কিংবা সামরিক চুক্তিতে যাওয়া প্রয়োজন। কোনো একটি পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে গিয়ে অন্য কোনো রাষ্ট্র বা অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্ক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
বিমান টিকিটের দাম নিয়ে অভিযোগ
প্রবাসী শ্রমবাজারে অনিয়ম ও বিমান টিকিটের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিষয়েও কথা বলেন এনসিপির মুখপাত্র।
তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন ধরনের সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে সৌদি আরবগামী বিমান টিকিটের দাম বর্তমানে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আসিফ মাহমুদ বলেন, দেশের বিভিন্ন খাতে নতুন করে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং প্রবাসে কর্মসংস্থানের জন্য যাওয়া শ্রমিকদের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের উদাহরণ
বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিদেশে যাওয়ার ব্যয় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের উদাহরণ দিয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, অন্যান্য দেশের কর্মীদের তুলনায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের সেখানে যেতে প্রায় ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে।
এ ধরনের ব্যয় কোনোভাবেই ন্যায্য নয় উল্লেখ করে তিনি প্রবাসী কর্মীদের বিদেশযাত্রার খরচ কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে শ্রমবাজারে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
১১ দলের লংমার্চ কর্মসূচি
১১ দলীয় বিরোধী জোট ছয় দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ধারাবাহিক আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এর অংশ হিসেবে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে প্রথম লংমার্চ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
জোটের ঘোষিত দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে গণভোটের গণরায় অবিলম্বে বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারসংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি।
এ ছাড়া প্রশাসনের সর্বস্তরে রাজনৈতিক দলীয়করণ বন্ধের দাবিও রয়েছে তাদের কর্মসূচিতে।
জোটের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে আরও তিনটি লংমার্চ কর্মসূচি পালন করা হবে। ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেট অভিমুখে লংমার্চ করার কথা রয়েছে।
সবশেষে আগামী ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশের মাধ্যমে ধারাবাহিক এই আন্দোলনের বড় পরিসরের কর্মসূচি শেষ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ১১ দলীয় জোট।
এদিকে ওমরাহ পালন শেষে দেশে ফিরে দেশবাসী, সহযোদ্ধা, প্রবাসী বাংলাদেশি ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। একই সঙ্গে দেশের চলমান সংকট ও জনদুর্ভোগের বিষয়গুলো রাজনৈতিকভাবে সামনে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
পাঠকের মন্তব্য