![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক হামলা চালালে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হবে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে একাধিক কূটনৈতিক ও সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করার পর থেকেই কূটনৈতিক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার পর ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে স্পষ্ট বার্তা পাঠায় যে, নতুন কোনো মার্কিন হামলা হলে এর জবাব শুধু ইরানের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত জ্বালানি স্থাপনা, মার্কিন সামরিক সম্পদ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও হামলার ঝুঁকিতে পড়বে।
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সৌদি আরব, কাতার, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে পৃথকভাবে যোগাযোগ করেন। এসব বৈঠকে তিনি আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখতে প্রভাব খাটায়।
একজন সিনিয়র আঞ্চলিক কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, আরাগচির মূল বার্তা ছিল—ইরান সংঘাত চায় না, তবে হামলা হলে পাল্টা জবাব দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার একমাত্র কার্যকর পথ হলো কূটনৈতিক সমাধান।
উপসাগরীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, তেহরানের সতর্কবার্তা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তাহলে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা, তেলক্ষেত্র, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শোধনাগার এবং মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালানো হবে।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব, কাতার ও ওমানসহ উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন করে সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করেছে। সূত্রগুলোর দাবি, ইরানের বার্তার পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলে সামরিক পদক্ষেপ স্থগিত রাখা, যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
তবে সৌদি আরব একই সঙ্গে স্পষ্ট করে দিয়েছে, তাদের ভূখণ্ড বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কোনো হামলা হলে তারা আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন করে কোনো হামলা হলে শুধু তেল স্থাপনা নয়, বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য কৌশলগত অবকাঠামোও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তার ভাষায়, ইরানের ওপর হামলার পরিণতি হবে আরও বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষতি।
তেহরান ২০১৯ সালে সৌদি আরবের আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ওই হামলায় সাময়িকভাবে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের বড় একটি অংশ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, সেই ঘটনার উদাহরণ টেনে ইরান বোঝাতে চাইছে যে, আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে এর প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দুটি কঠিন বিকল্পের মুখে রয়েছেন। একদিকে নতুন সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বড় ধরনের সংঘাত সৃষ্টি করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে ওয়াশিংটনকে এমন একটি সমাধান মেনে নিতে হতে পারে, যা তাদের প্রত্যাশিত রাজনৈতিক বা কৌশলগত সাফল্য পুরোপুরি নিশ্চিত করবে না।
এদিকে আঞ্চলিক কূটনীতিকরা মনে করছেন, উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট দেশগুলো এখন সামরিক সংঘাত এড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের পথ খুঁজছে।
পাঠকের মন্তব্য