ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সরকার ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি, আধুনিক হাসপাতাল অবকাঠামো এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের মানুষকে বিশ্বমানের চিকিৎসা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শনিবার (১১ জুলাই) ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান প্রজন্মের চিকিৎসা শিক্ষার্থী ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দক্ষতা, মানবিকতা এবং পেশাগত নিষ্ঠার মাধ্যমেই চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতের চিকিৎসকরাই দেশের স্বাস্থ্যখাতে নতুন আস্থা তৈরি করবেন।
চিকিৎসক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, একজন চিকিৎসক শুধু রোগ নিরাময় করেন না, তিনি মানুষের জীবনের কঠিন মুহূর্তে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবেও পাশে থাকেন। তাই পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক আচরণ ও সহমর্মিতাও একজন চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় গুণ হওয়া উচিত।
স্বাস্থ্যসেবা নির্বিঘ্ন রাখতে হাসপাতালগুলোর নিরাপত্তা আরও জোরদার করার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি হাসপাতালে ১০ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতে জনবল সংকট দূর করতে সরকার আরও ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করেছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, মিডওয়াইফসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য পেশার শূন্যপদ দ্রুত পূরণ করা হবে।
প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “Prevention is better than cure”—এই নীতিকে সামনে রেখে সরকার দেশের প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে কাজ করছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি রোগ, ক্যানসার, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর বিকাশ এবং টিকাদানসহ বিভিন্ন বিষয়ে আগাম স্বাস্থ্যপরামর্শের মাধ্যমে অনেক রোগ প্রাথমিক পর্যায়েই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তিনি জানান, সারাদেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকর করতে এক লাখ হেলথ কেয়ারার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হেলথ কেয়ারার পরিবারভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে স্বাস্থ্যখাতের সর্বোচ্চ বাজেট। বর্তমানে এটি জিডিপির ১.০২ শতাংশ হলেও আগামী পাঁচ বছরে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সরকার ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের স্টেন্ট, হার্টের ভাল্ব, পেসমেকার, অক্সিজেনেটর, চোখের লেন্স এবং ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু কাঁচামালের ওপর ভ্যাট ও কর কমিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ কর প্রত্যাহারও করা হয়েছে, যাতে রোগীরা কম খরচে চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, দেশের সব উপজেলায় ৩১ থেকে ৫১ শয্যার হাসপাতালগুলো পর্যায়ক্রমে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিশুস্বাস্থ্য উন্নয়নের অংশ হিসেবে বরিশাল ও রাজশাহীতে নির্মিত ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতালসহ মোট পাঁচটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল দ্রুত চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এতে রাজধানীর বাইরে উন্নত শিশুচিকিৎসা আরও সহজলভ্য হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
বক্তব্যের শেষদিকে মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের পাশাপাশি হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানসম্মতভাবে মেডিক্যাল বর্জ্য অপসারণ এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান।
পাঠকের মন্তব্য