![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ বলে ঘোষণা দেওয়ার পর নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় রিপাবলিকান দলের ভেতরেও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন দলটির নেতারা।
গত বুধবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইরানের সঙ্গে অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি আর কার্যকর নেই। এর কিছুক্ষণ পরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক হামলা চালায়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ওই অঞ্চলে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
এর আগে গত মাসে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর এটিই ছিল সবচেয়ে কার্যকর যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের জেরে সেই সমঝোতাও ভেঙে গেছে।
যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর রিপাবলিকান নেতারা নতুন করে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন। দলটির অনেক নেতা আগেই হোয়াইট হাউসকে সতর্ক করেছিলেন যে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব মধ্যবর্তী নির্বাচনে পড়তে পারে।
ইতোমধ্যে নতুন সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনকারী সংগঠন রিপাবলিকান মেইন স্ট্রিট পার্টনারশিপ-এর সভাপতি সারাহ চেম্বারলেইন বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া তাদের জন্য বড় রাজনৈতিক উদ্বেগের বিষয়। তার ভাষায়, ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো জীবনযাত্রার ব্যয়। জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকলে সেটি রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
তবে তিনি মনে করেন, হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে ভোটারদের সামনে তুলে ধরা উচিত।
অন্যদিকে হোয়াইট হাউসও প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছে। মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, ট্রাম্প জনমত জরিপ দেখে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার দাবি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গে একমত নন। জুন মাসে প্রকাশিত একটি জরিপে ৫৮ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার মনে করেন, ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। একই সঙ্গে বিপুল সংখ্যক ভোটার দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের বড় অংশ প্রকাশ্যে খুব বেশি মন্তব্য করছেন না। একদিকে তারা ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন ধরে রাখতে চাইছেন, অন্যদিকে নিজেদের নির্বাচনী এলাকার যুদ্ধবিরোধী জনমতও উপেক্ষা করতে পারছেন না।
কেনটাকির রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান থমাস ম্যাসি যুদ্ধ নিয়ে সরব সমালোচকদের অন্যতম। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করে যুদ্ধ এবং দলীয় নেতৃত্বের সমালোচনা করেন।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা এই ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। তাদের অভিযোগ, ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে। নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান ড্যান গোল্ডম্যান বলেছেন, খাদ্য, বাসাভাড়া ও স্বাস্থ্যসেবার খরচ বাড়ার পাশাপাশি এখন বিমান ভাড়াও বেড়েছে, যার জন্য তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিকেই দায়ী করেন।
ডেমোক্র্যাটরা একই সঙ্গে কংগ্রেসে ওয়ার পাওয়ার্স রেজ্যুলিউশন কার্যকর করে প্রেসিডেন্টকে ইরান সংঘাত থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের আহ্বানও জানিয়েছে।
এদিকে তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা সম্ভব হলেও দেশটির নেতৃত্বের প্রতি তার আস্থা নেই। তিনি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও তেল স্থাপনার বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকে, তাহলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
পাঠকের মন্তব্য