
ইবি রিপোর্ট
দেশের আর্থিক খাতে আমানত ও ঋণের দিক থেকে শীর্ষে থাকা ইসলামী ব্যাংক কয়েক মাস ধরে এক সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ ও নিয়মিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছাড়াই চলছে। এতে বিশেষ করে করপোরেট গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। ঋণ অনুমোদন, ঋণ নবায়ন, সীমা বাড়ানো এবং বড় অঙ্কের আমদানি-রপ্তানি অর্থায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও জটিলতা দেখা দিয়েছে।
ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বড় করপোরেট গ্রাহকদের ঋণসংক্রান্ত প্রস্তাব নিয়মিত প্রক্রিয়ায় এগোলেও চূড়ান্ত অনুমোদনের পর্যায়ে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে আটকে যাচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ না থাকায় নতুন ঋণ, ঋণ নবায়ন ও সীমা বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ব্যাংকটির মাধ্যমে কর্মীদের বেতন-ভাতা, আমদানি-রপ্তানি ও চলতি মূলধনের অর্থায়ন করলেও প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়ন পেতে দেরি হচ্ছে।
এর মধ্যে চাকরিচ্যুত কর্মীদের পুনর্বহাল ও নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের দাবিতে আন্দোলন এবং এর বিরোধিতায় পাল্টা কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গত দুই দিনের কর্মসূচিতে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, হাতাহাতি ও ইটপাটকেলের ঘটনায় অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে উভয় পক্ষের নেতারা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিষয়টি আদালতেও রয়েছে। একই সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের জন্য যোগ্য ও নিরপেক্ষ নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের প্রক্রিয়াও চলছে।
ব্যাংকটির নিয়মিত এমডির পদ প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে শূন্য। এর আগে এমডি ওমর ফারুক খানকে গত ১৩ এপ্রিল তৎকালীন পর্ষদ ছুটিতে পাঠায়। পরে তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে ভারপ্রাপ্ত এমডির মাধ্যমে ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রম চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী, এমডির পদ তিন মাসের বেশি শূন্য রাখার সুযোগ নেই; তবে যৌক্তিক কারণ থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সময় বাড়াতে পারে।
পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ না থাকায় ব্যাংকটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত এমডিসহ আট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ও আটকে আছে। এরই মধ্যে তিন কর্মকর্তার চাকরির মেয়াদ শেষ হয়েছে। অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন মজুমদারের মেয়াদ ১১ সেপ্টেম্বর এবং উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব আলম ও সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট আমিনুর রহমানের মেয়াদ ৯ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে। আরও কয়েকজন কর্মকর্তার চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
গত ১৪ জুন ইসলামী ব্যাংকের পুরো পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে পর্ষদের দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. জহির হোসেনকে দেওয়া হয়। এর আগে ২৪ মে চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে স্বতন্ত্র পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাতেও অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে। ব্যাংকটির আমানত ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে ১ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকায় নেমেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পরিচালন লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা খেলাপি ঋণ। চলতি বছরের জুন শেষে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫২ শতাংশ। দেশের ব্যাংকিং খাতেও এটি সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের পরিমাণ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ সময় ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বের পদ শূন্য থাকলে গ্রাহকদের আস্থা কমতে পারে। বিশেষ করে করপোরেট গ্রাহকদের দ্রুত ঋণ, এলসি ও অন্যান্য সেবা প্রয়োজন হওয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে তারা বিকল্প ব্যাংকের দিকে যেতে পারেন। ফলে ইসলামী ব্যাংকের স্থিতিশীলতা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ ও কার্যকর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাঠকের মন্তব্য