
ইবি রিপোর্ট
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১০ হাজার ৮৩২ জন কর্মী নিয়োগ দেয়। এর মধ্যে ৮ হাজার ৫৪২ জনকে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও নিয়মিত নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিদর্শনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। একই সময়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের বড় একটি অংশ চট্টগ্রামের, বিশেষ করে পটিয়ার বাসিন্দা হওয়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময়ে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ছিল এস আলম। ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট ব্যাংকটির মোট কর্মী ছিল ২১ হাজার ৫৫১ জন। এর মধ্যে ২০১৭ সালের পর থেকে ১০ হাজার ৮৩২ জন নিয়োগ পান। তাঁদের মধ্যে ৪৬৬ জন লেটারাল এন্ট্রিতে এবং ১০ হাজার ৩৩৬ জন সরাসরি প্রবেশ পর্যায়ে নিয়োগ পান।
ব্যাংকের প্রচলিত নিয়োগবিধিতে বিভিন্ন পদে নিয়োগের জন্য অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বিধান ছিল। প্রার্থীদের আবেদনের জন্য কমপক্ষে ১৫ দিন সময় দেওয়ার কথা। এরপর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার নিয়ম ছিল। দুই পরীক্ষায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বর পাওয়া ছিল নিয়োগের ন্যূনতম যোগ্যতা। কিন্তু ২০১৭ সালে মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তনের পর এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে। ওই সময় ৮ হাজার ৫৪২ জনকে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে নিয়মসিদ্ধ দেখাতে মানবসম্পদ নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়। নতুন বিধানে ‘জরুরি প্রয়োজন’ দেখা দিলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজন অনুযায়ী এন্ট্রি ও লেটারাল এন্ট্রি পর্যায়ে কর্মী নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ হলো, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে মূল নিয়োগবিধির বিজ্ঞপ্তি ও আবেদনের সময়সংক্রান্ত বিধান কার্যত উপেক্ষা করা হয়েছে।
সাধারণত জরুরি পরিস্থিতিতে সীমিতসংখ্যক লেটারাল এন্ট্রি বা বিশেষায়িত কারিগরি পদে নিয়োগের সুযোগ থাকার কথা। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকে এই বিধান ব্যবহার করে প্রবেশনারি পর্যায়েই ছয় হাজারের বেশি কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এটিকে অস্বাভাবিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সে সময় ব্যাংকে বড় ধরনের জনবল সংকট ছিল—এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি। বরং বিজ্ঞপ্তি ছাড়া বিপুল নিয়োগ ব্যাংকের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ছিল বলে ওই সময়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
নিয়োগপ্রাপ্তদের ভৌগোলিক অবস্থানও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এস আলমের নিয়ন্ত্রণকালে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের ছিলেন ৮ হাজার ৯৯ জন। তাঁদের মধ্যে ৫ হাজার ১৪৮ জন পটিয়ার বাসিন্দা। পটিয়া এস আলমের জন্মস্থান হওয়ায় এই নিয়োগের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি না থাকায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলের প্রার্থীরা আবেদন ও প্রতিযোগিতার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিয়োগের ক্ষেত্রে ভিন্ন একটি পদ্ধতির কথাও জানিয়েছে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের পটিয়ার বাড়ি ও চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ কার্যালয়ে বিভিন্ন বাক্স রাখা হতো। এসব বাক্সে বিভিন্ন এলাকা, নারী-পুরুষ এবং পদের পরিচয় লেখা থাকত। সেখানে জমা দেওয়া জীবনবৃত্তান্ত থেকে পছন্দের প্রার্থীদের বাছাই করে পরে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হতো এবং সেখান থেকেই নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে বলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
প্রবেশনারি অফিসারদের ২৬টি ব্যাচের মধ্যে ২৪তম ব্যাচের নিয়োগেও নিয়ম মানা হয়নি বলে পরিদর্শনে প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৯ সালের শুরুতে চট্টগ্রাম থেকে ৮৪০ জনের তালিকা পাঠানো হয়। তাঁদের মধ্যে ৭৬৩ জন লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন। নিয়ম অনুযায়ী পাস নম্বর ছিল ৫০ শতাংশ। কিন্তু এই নম্বর পান মাত্র ৩৬ জন। পরে পাস নম্বর কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হলে ৫৫২ জনকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। শেষ পর্যন্ত ৩০৪ জন মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
এ ছাড়া লিখিত পরীক্ষা না দিয়েই ১২ জনকে শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করা হয়। পরে মোট ১৯০ জনকে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ১৮৪ জন চাকরিতে যোগ দেন। একই সময়ে ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার, ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ) এবং ট্রেইনি জুনিয়র অফিসার পদেও বিজ্ঞপ্তি ছাড়া যথাক্রমে ২ হাজার ২৩২, ২ হাজার ৮২৮ ও ৫০১ জন নিয়োগের তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
লেটারাল এন্ট্রিতেও একই ধরনের অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় ৪৬৬ জন নিয়োগ পান। তাঁদের মধ্যে ২৬৪ জন চট্টগ্রাম জেলার প্রার্থী। এ ছাড়া ঢাকায় কর্মরত ওই সময়ের ১০ কর্মকর্তার লিখিত বক্তব্য নেওয়া হলে সবাই জানান, তাঁরা জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়ে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন। দুজন জানান, তাঁরা কোনো মৌখিক পরীক্ষাও দেননি।
শুধু সাধারণ কর্মী নয়, উচ্চপর্যায়ের পদোন্নতিতেও নিয়োগবিধি না মানার তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডিএমডি পদে যেতে আগের পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতা এবং মোট ২০ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত ছিল। কিন্তু এস আলমের ব্যক্তিগত সহকারী আকিজ উদ্দিন আট বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা নিয়ে ডিএমডি হন। একইভাবে ডিএমডি মিফতাহ উদ্দিনের মোট অভিজ্ঞতা ছিল ১৭ বছর এবং আগের পদে অভিজ্ঞতা ছিল এক বছর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের পর ইসলামী ব্যাংকের নীতিগত পরিবর্তনগুলো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়োগে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি যুক্ত থাকে না। তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও নির্দেশনা দেওয়া হবে।
পরবর্তীতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়া হয়। মোট ৫ হাজার ৩৭৩ কর্মকর্তার মধ্যে ৪০২ জন পরীক্ষায় অংশ নেন এবং সবাই উত্তীর্ণ হন। অন্যদিকে ৪ হাজার ৯৭২ জন পরীক্ষায় অংশ নেননি। পরে মানবসম্পদ নীতিমালা অনুসারে ৪ হাজার ৬৮৫ জনকে তিন মাসের বেতন দিয়ে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হোসাইন বলেছেন, শুধু নিয়োগ বৈধ না অবৈধ—এই বিবেচনায় কর্মীদের চাকরিচ্যুত করা হয়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়োগের সময় প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণ করা হয়নি। সেই প্রক্রিয়া পূর্ণ করার সুযোগ হিসেবে দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মীরা পরীক্ষায় অংশ নেননি এবং অন্যদেরও বাধা দিয়েছেন। ফলে ব্যাংকের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করায় তাঁদের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে।