![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
টানা ভারী বর্ষণে আবারও ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। নগরের বিভিন্ন এলাকায় কোমরসমান পানি জমে জনজীবন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে যান চলাচল, কর্মস্থলে পৌঁছাতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো মানুষ। অনেক বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বাসিন্দারা।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের চিত্র দেখা গেছে পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, কাতালগঞ্জ, চকবাজার, আগ্রাবাদ, চান্দগাঁও, শুলকবহর, কাপাসগোলা ও হাটহাজারী সড়কে। কোথাও হাঁটু, আবার কোথাও কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। অনেক এলাকায় পানির তীব্র স্রোতের কারণে মানুষের স্বাভাবিক চলাচলও ব্যাহত হয়েছে।
পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার একটি ভবনের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ সেলিম জানান, বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় জেনারেটরের তেল শেষ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে কোমরসমান পানি মাড়িয়ে ফিলিং স্টেশন থেকে তেল আনতে হয়েছে। অনেক কষ্টে একটি রিকশা পেলেও পানির উচ্চতায় রিকশার সিট পর্যন্ত ডুবে গিয়েছিল।
চকবাজারের উর্দু গলি, হাসমত উল্লাহ মুন্সেফ লেইন, তেলিপট্টি, চক সুপার মার্কেট ও কাপাসগোলাসহ আশপাশের এলাকায় কোমরসমান পানি জমেছে। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হামিদ বলেন, তার বাড়িতে পানি না উঠলেও পুরো এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও পানির স্রোত এতটাই তীব্র যে মানুষ ও যানবাহনের চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম-হাটহাজারী সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে।
কর্মস্থলে পৌঁছাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা
ইপিজেড এলাকায় হাঁটুসমান এবং আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় কোমরসমান পানি জমেছে। এ অবস্থায় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে অফিসগামী কর্মজীবীদের।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আল আমিন জানান, কোমরসমান পানি পেরিয়ে কর্মস্থলে যেতে হয়েছে তাকে। একইভাবে চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা আবু আজাদ বলেন, নিজের বাসা থেকে প্রধান সড়কে উঠতে এক কিলোমিটারেরও কম পথ অতিক্রম করতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লেগেছে। এলাকার বহু বাড়ির নিচতলা পানিতে তলিয়ে গেছে। ফরিদারপাড়া ও শমসেরপাড়াসহ আশপাশের এলাকাও প্লাবিত হয়েছে।
নতুন নতুন এলাকাও পানির নিচে
বুধবারের টানা বর্ষণে নতুন করে সিডিএ ১ নম্বর, সিটি গেট, জামালখানের হেমসেন লেন, নাসিরাবাদ ওমেন কলেজ এলাকা, জিইসি মোড়, ফয়’স লেক, গরিব উল্লাহ শাহ মাজার এলাকা এবং ইস্পাহানি রেলগেটসহ আরও অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
অনেক বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নষ্ট হয়েছে। পরিস্থিতির কারণে অনেক পরিবার নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।
হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের পরও মিলছে না স্থায়ী সমাধান
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড যৌথভাবে প্রায় ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব প্রকল্পের বেশিরভাগ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে বাস্তবে ভারী বৃষ্টি হলেই আগের মতোই তলিয়ে যাচ্ছে নগরের বিস্তীর্ণ এলাকা।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, এটি একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। একদিনে ৪০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হলে বিশ্বের যেকোনো শহরেই জলাবদ্ধতা বা বন্যার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তিনি এ দুর্যোগ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক না করে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে সিডিএ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ শেষ হয়েছে এবং স্লুইস গেট ও রেগুলেটরগুলো সর্বোচ্চ সক্ষমতায় পানি নিষ্কাশনের কাজ করছে। তবে অল্প সময়ের মধ্যে ৪১২ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত সামাল দেওয়া যেকোনো আধুনিক শহরের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে খাল পুনরুদ্ধার, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাধার সংরক্ষণ এবং সমন্বিত নগর পরিকল্পনার বিকল্প নেই।