![]()
ইরানকেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের জেরে বৈশ্বিক বিমান চলাচলে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। আড়াই মাস পার হলেও বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় রুটে বিমানভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেশি রয়েছে। আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে ভাড়া আরও বেড়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ধীরে ধীরে ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক হলেও অনেক রুটে ভাড়া এখনো স্বাভাবিক মৌসুমি দামের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি। আসনসংখ্যা কমে যাওয়া, জ্বালানি সারচার্জ এবং ঈদকেন্দ্রিক অতিরিক্ত চাহিদা এর প্রধান কারণ।
বিশেষ করে শ্রমনির্ভর মধ্যপ্রাচ্য রুট, আঞ্চলিক পর্যটন গন্তব্য এবং অভ্যন্তরীণ সৈয়দপুর রুটে চাপ বেশি দেখা যাচ্ছে। বাড়তি যাত্রী সামাল দিতে বিভিন্ন এয়ারলাইন অতিরিক্ত ফ্লাইটও পরিচালনা করছে।
বাংলাদেশ আউটবাউন্ড ট্যুর অপারেটরস ফোরাম-এর সভাপতি চৌধুরী হাসানুজ্জামান রনি বলেন, সাধারণত শেষ মুহূর্তে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যটক ভ্রমণ বুকিং নিশ্চিত করলেও এবার সেই হার নেমে এসেছে মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশে।
তার ভাষায়, উচ্চ বিমানভাড়ার কারণে অনেক সম্ভাব্য ভ্রমণকারী পরিকল্পনা বাতিল করছেন অথবা ঈদের পর পর্যন্ত ভ্রমণ পিছিয়ে দিচ্ছেন।
চলতি বছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত তীব্র হলে বিশ্বজুড়ে শত শত ফ্লাইট বাতিল হয়। এর প্রভাবে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যগামী ট্রানজিটনির্ভর রুটগুলোতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। একই সময়ে জেট ফুয়েলের দামও বেড়ে যায়, ফলে এয়ারলাইনগুলো অতিরিক্ত জ্বালানি সারচার্জ আরোপ করে।
যদিও সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানির দাম কিছুটা কমেছে, এয়ারলাইনগুলো বলছে পরিচালন ব্যয় এখনো যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় বেশি।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স-এর ওয়েবসাইটে দেখা গেছে, ২৪ জুনের ঢাকা-রিয়াদ রুটের টিকিটের দাম ছিল ৬৩ হাজার ৮০০ টাকা এবং ঢাকা-জেদ্দা রুটের ভাড়া ৭৩ হাজার ৬৬৯ টাকা। এসব ভাড়া সংঘাতের আগের সময়ের তুলনায় অন্তত ১০ হাজার টাকা বেশি।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স-এর মুখপাত্র কামরুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি। জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় এখনো আগের তুলনায় বেশি রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঈদকেন্দ্রিক যাত্রীচাপ বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য রুট এবং মালদ্বীপগামী ভ্রমণে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।
উচ্চ ভাড়ার পরও সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপের মতো গন্তব্যে মাঝারি মাত্রার চাহিদা রয়েছে। তবে বিকল্প গন্তব্যে ভ্রমণে ভিসা জটিলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাসানুজ্জামান রনি জানান, দুবাই এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি, ইন্দোনেশিয়ার ভিসা পেতে প্রায় দেড় মাস সময় লাগছে এবং ভিয়েতনাম অনেক ভ্রমণকারীর নাগালের বাইরে চলে গেছে।
বর্তমানে শ্রীলঙ্কাগামী যাওয়া-আসার ভাড়া ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা, যা আগে ছিল ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকা। নেপালের ভাড়া বেড়ে প্রায় ৬০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। মালয়েশিয়াগামী ফিরতি টিকিটের দাম ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা এবং মালদ্বীপগামী ভাড়া এখন ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকার মধ্যে।
আরেক ট্যুর অপারেটর তাসলিম আমিন শোভন জানান, আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে যাত্রীসংখ্যা এখনো স্বাভাবিকের তুলনায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কম। তার মতে, যুদ্ধকালীন ভাড়ার ধাক্কা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
তিনি বলেন, এখন পর্যটনের বদলে ব্যবসায়িক ও করপোরেট ভ্রমণ বেশি হচ্ছে। নতুন গন্তব্য হিসেবে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানে ভ্রমণ বাড়ছে।
অভ্যন্তরীণ রুটেও ঈদের চাপ পড়েছে। গতকাল নভোএয়ার-এর ওয়েবসাইটে দেখা যায়, ৩১ মে সৈয়দপুর-ঢাকা রুটের ভাড়া ৯ হাজার ১৪৯ টাকা থেকে ১২ হাজার ১৪৯ টাকার মধ্যে ছিল।
নভোএয়ারের বিক্রয় ও বিপণন পরিচালক সোহেল মাজিদ বলেন, অনেক যাত্রী কেবল সর্বোচ্চ প্রকাশিত ভাড়া দেখেন, যদিও অধিকাংশ আসনই প্রমোশনাল ভাড়ায় বিক্রি হয়। তার দাবি, সৈয়দপুর রুটে এখনো ৩ হাজার ৬৫০ টাকা থেকেও টিকিট পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি জানান, সরকার জেট ফুয়েলের দাম কমানোর পর নভোএয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাড়া সমন্বয় করেছে।
গত ২৩ মে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন জানায়, জেট ফুয়েলের দাম প্রতি লিটারে ৩৯ দশমিক ৫৭ টাকা কমানো হয়েছে। সংশোধিত দরে দেশীয় এয়ারলাইনগুলোর জন্য জেট এ-১ ফুয়েলের মূল্য প্রতি লিটার ২০৫ দশমিক ৪৫ টাকা থেকে কমিয়ে ১৬৫ দশমিক ৮৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য