![]()
ভারতের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম আবারও বড় একটি মাইলফলক স্পর্শ করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটির সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ৫৫ হাজার ২০০-এর বেশি স্টার্টআপকে স্বীকৃতি দিয়েছে—যা একক বছরে সর্বোচ্চ। এই অর্জন শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, বরং উদ্যোক্তা পরিবেশের দ্রুত বিস্তার ও অর্থনীতিতে এর প্রভাবের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় স্বীকৃত স্টার্টআপের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৫১.৬ শতাংশ। একই সময়ে এসব স্টার্টআপের মাধ্যমে সরাসরি কর্মসংস্থানও বেড়েছে প্রায় ৩৬.১ শতাংশ, যা স্টার্টআপভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী ইঙ্গিত দেয়।
এই নতুন সংযোজনের ফলে ভারতে মোট স্বীকৃত স্টার্টআপের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২.২৩ লাখের বেশি। এসব স্টার্টআপ সম্মিলিতভাবে ইতোমধ্যে ২৩ লাখেরও বেশি সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরেই প্রায় ৫ লাখ নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে সরকারের ধারাবাহিক নীতি সহায়তা ও অর্থায়ন উদ্যোগ। ‘স্টার্টআপ ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের আওতায় ফান্ড অব ফান্ডস, সিড ফান্ড স্কিম এবং ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের মতো বিভিন্ন কর্মসূচি উদ্যোক্তাদের জন্য পুঁজি ও সহায়তা নিশ্চিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ফান্ড অব ফান্ডসের মাধ্যমে ৭ হাজার কোটিরও বেশি রুপি বিভিন্ন বিনিয়োগ তহবিলে বিতরণ করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে স্টার্টআপগুলোতে বিনিয়োগ হিসেবে গেছে।
এছাড়া স্টার্টআপ ইন্ডিয়া সিড ফান্ড স্কিমের আওতায় শতাধিক ইনকিউবেটর নির্বাচিত হয়ে হাজার হাজার স্টার্টআপকে প্রাথমিক পর্যায়ের অর্থায়ন দিয়েছে। একই সঙ্গে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম সম্প্রসারণের ফলে উদ্যোক্তারা সহজে ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
শুধু অর্থায়নই নয়, উদ্ভাবনেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। স্টার্টআপগুলোর মাধ্যমে ১৯ হাজারের বেশি পেটেন্ট আবেদন জমা পড়েছে, যা প্রযুক্তি ও গবেষণাভিত্তিক উদ্যোক্তা কার্যক্রমের বিস্তারকে নির্দেশ করে।
ভারতের স্টার্টআপ প্রবৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর ভৌগোলিক বিস্তার। আগে যেখানে মূলত বড় শহরগুলোতেই স্টার্টআপ কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল, এখন ছোট শহর ও গ্রামীণ অঞ্চল থেকেও নতুন উদ্যোক্তারা উঠে আসছেন। মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ ও গুজরাট—এই রাজ্যগুলো বর্তমানে স্টার্টআপ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে শীর্ষে রয়েছে।
এই প্রবণতা দেখাচ্ছে যে, স্টার্টআপ এখন আর শুধুমাত্র প্রযুক্তিনির্ভর শহুরে উদ্যোগ নয়; বরং এটি একটি জাতীয় অর্থনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ফিনটেক, এগ্রিটেক, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং ক্লিন এনার্জির মতো খাতে নতুন নতুন উদ্ভাবন ভারতকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিচ্ছে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বিনিয়োগের গতি কিছুটা মন্থর হওয়া, স্কেলিং সমস্যা এবং নীতিগত জটিলতা এখনও অনেক স্টার্টআপের জন্য বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। তারপরও সামগ্রিকভাবে ভারতের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে এবং বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম স্টার্টআপ হাব হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করছে।
বাংলাদেশের জন্যও এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। সঠিক নীতি সহায়তা, অর্থায়ন কাঠামো এবং উদ্যোক্তা বান্ধব পরিবেশ তৈরি করা গেলে বাংলাদেশেও স্টার্টআপ খাত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
উপসংহার:
ভারতের এই সাফল্য প্রমাণ করে—সঠিক নীতি, বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনের সমন্বয় ঘটলে একটি দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম কত দ্রুত বিকশিত হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এখন সময় সেই পথ অনুসরণ করে নিজেদের উদ্যোক্তা সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করার।