![]()
ইবি রিপোর্ট
দুই অর্থবছরে সিস্টেম লসের কারণে তিতাস গ্যাস হারিয়েছে ৫,১৪০ কোটি টাকা। চার বছরে এই অপচয় প্রায় পাঁচগুণ বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯.৯৬ শতাংশে ঠেকেছে। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত এই বৃহৎ পরিবেশক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে।
নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সিস্টেম লসের অঙ্ক ২,৭১৯ কোটি টাকা। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের সবচেয়ে বড় এই বিতরণ সংস্থার ক্ষতি ছিল ২,৪২২ কোটি টাকা। এই দুই বছরে তিতাসের পুঞ্জীভূত ক্ষতি দাঁড়িয়েছে মোট ৫,১৪০ কোটি টাকায়।
পেট্রোবাংলার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই অঙ্ক এলএনজি আমদানিতে সরকারের ভর্তুকির এক-তৃতীয়াংশের বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই মোট ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ১৪,৬০০ কোটি টাকা। জিটিসিএল থেকে তিতাস যে গ্যাস নেয় এবং গ্রাহককে বিল করতে পারে, তার ব্যবধানই সিস্টেম লস।
সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার ধারা
২০১৯-২০ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত তিতাস সিস্টেম লস ২ শতাংশের মধ্যে রাখতে পেরেছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায় এবং লস বেড়ে হয় ৫.২৮ শতাংশ। পরের তিন অর্থবছরে তা দাঁড়ায় যথাক্রমে ৭.৬৭, ৯.৪৭ এবং রেকর্ড ৯.৯৬ শতাংশে।
সরকারি নীতিমালায় তিতাস সর্বোচ্চ ২ শতাংশ পর্যন্ত সিস্টেম লস দেখাতে পারে। এর বাইরের যেকোনো ক্ষতির দায় কোম্পানিকে নিজস্ব তহবিল থেকে মেটাতে হয়। নিরীক্ষিত প্রতিবেদনে তিতাস জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সীমার চেয়ে ৭.৯৬ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি লস হয়েছে। এই গ্যাস কিনতে খরচ হলেও তার বিপরীতে কোনো রাজস্ব আসেনি।
ফলে কোম্পানির মুনাফায় বড় ধস নেমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৫৯৫ কোটি টাকা। এর ফলে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) গিয়ে ঠেকেছে ঋণাত্মক ৬.০২ টাকায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও কোম্পানিটি ৭৭২ কোটি টাকার নিট লোকসান ঘোষণা করেছিল। ২০২২-২৩ থেকে ২০২৫-২৬ পর্যন্ত চার অর্থবছরে পুঞ্জীভূত নিট লোকসান হয়েছে ২,২৭৫ কোটি টাকা।
এত ঘাটতির পরও কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের ২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সুপারিশ করেছে। এর ভিত্তি রিটেইন্ড আর্নিংস এবং স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) সুদের মতো অ-পরিচালনগত আয়।
নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান একনাবিনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিতাস মোট ১৫,৪২৮ এমএমসিএফ গ্যাস পেয়েছে। কিন্তু গ্রাহকের কাছে বিক্রি করতে পেরেছে মাত্র ১৩,৮৯২ মিলিয়ন ঘনফুট। বাকি ১,৫৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস বিলবিহীন বা অপচয় হয়েছে, যার মূল্য ২,৭১৯ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অপচয়কৃত ১,৪৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মূল্য ছিল ২,৪২১.৭৬ কোটি টাকা।
অবৈধ সংযোগ ও জরাজীর্ণ অবকাঠামো
কর্মকর্তারা বাড়তি লসের জন্য অবৈধ সংযোগ ও ক্ষয়প্রাপ্ত পাইপলাইনকে দায়ী করছেন। পৌর কর্তৃপক্ষের রাস্তা খোঁড়ায় পাইপলাইনের অনিচ্ছাকৃত ক্ষতিকেও তাঁরা কারণ হিসেবে দেখছেন। ত্রুটিপূর্ণ মিটারিং এবং মিটারবিহীন আবাসিক গ্রাহকের অনুমানভিত্তিক বিলিংও এই তালিকায় রয়েছে।
তিতাসের ভিজিল্যান্স ডিভিশনের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার আবু সাদাত মো. সায়েম এই চার কারণ চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, “এসব সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান এখনো দূরঅস্ত। যার ফলে প্রতি বছর সিস্টেম লস লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এতে করে, তিতাসের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।”
তাঁর ভাষ্যে, তিতাসের বিতরণ নেটওয়ার্কের বড় অংশ ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে বসানো হয়েছিল। গ্যাস বিতরণের এসব পাইপলাইন ৩০ বছরের স্বাভাবিক মেয়াদও পার করে ফেলেছে। তিনি যোগ করেন, “এই জরাজীর্ণ পাইপলাইন দিয়ে লিকেজমুক্ত নিরাপদ গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখা দিন দিন অসম্ভব হয়ে পড়ছে।”
ড্রেনেজ খননের সময় সরকারি সংস্থা বা পৌর কর্তৃপক্ষের হাতে পাইপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন অগোচরেই দীর্ঘ সময় ধরে সেখান থেকে গ্যাস লিক হয়ে যেতে থাকে। তবে আবু সাদাত সায়েমের মতে, অবৈধ সংযোগই গ্যাস অপচয়ের সবচেয়ে বড় উৎস।
তিনি বলেন, “আবাসিক এলাকা ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে অবৈধভাবে মূল লাইন থেকে সংযোগ নেওয়া নিত্যদিনের ঘটনা। আমাদের এনফোর্সমেন্ট টিম লাইনগুলো বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পরপরই— স্থানীয় অসাধু চক্র পুনরায় সেই বিচ্ছিন্ন সংযোগ স্থাপন করে ফেলে—যা ঠেকানো খুবই কঠিন।”
জিটিসিএলের ২৭টি প্রধান হাই-প্রিসিশান মিটারের সঙ্গে তিতাসের প্রায় ১,৫০০ সেকেন্ডারি মিটারের পরিমাপ মেলে না। বিতরণ নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত এসব মিটারের পরিমাপের অমিল সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলছে।
আবাসিকে অপরিবর্তিত ট্যারিফ
মিটারহীন আবাসিক গ্রাহকের বিলিং পদ্ধতি তিতাসের বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিইআরসির ২০২২ সালের নিয়মে একক চুলার জন্য মাসে ৫৫ ঘনমিটার গ্যাস ধরা হয়। আর দুই চুলার জন্য মাসিক ব্যবহারের হিসাব ধরা হয় ৬০ ঘনমিটার।
বাস্তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রকৃত ব্যবহার এই হিসাবের চেয়ে বেশি হয়। ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলে একটি চুলা ব্যবহার করে ভাড়াটেদের একাধিক পরিবারও রান্নাবান্না করে। অনেক সময় পানি ফোটানো ও বাণিজ্যিক কাজে চুলা অনবরত জ্বালিয়ে রাখা হয়।
২০২৩ সালে বিইআরসির কাছে তিতাস প্রাক্কলিত সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব জমা দেয়। প্রিপেইড মিটার চালুর আগ পর্যন্ত এক বার্নারে ৭৬.৬৫ ও দুই বার্নারে ৮৮.৮৮ ঘনমিটার চাওয়া হয়। তবে বিইআরসির কাছে জমা দেওয়া সেই প্রস্তাব এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হয়নি।
টার্নওভার ট্যাক্সের চাপ
তিতাসের অর্থ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. নূর হোসেন খান বিদ্যমান কর কাঠামোকে চাপের কারণ বলছেন। তাঁর ভাষায়, “সিস্টেম লসের বাইরে বর্তমান কর কাঠামো আমাদের ওপর বড় ধাক্কা দিচ্ছে। মূল পরিচালন খাত থেকে রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় শেয়ারহোল্ডাদের লভ্যাংশ প্রদান ও কোম্পানি সচল রাখতে—আমাদের এফডিআরের মতো অ-পরিচালন আয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে হচ্ছে।”
ফাইন্যান্স অ্যাক্ট ২০২৬ অনুযায়ী তিতাসের করপোরেট আয়করের হার ২০ শতাংশ। আইনের ১৬৩ ধারায় হিসাবকৃত কর টার্নওভারের নির্দিষ্ট সীমার নিচে নামলে সর্বনিম্ন টার্নওভার ট্যাক্স দিতে হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কর-পূর্ব নিট লোকসান হওয়ায় তিতাসের ওপর সাধারণ আয়কর প্রযোজ্য ছিল না। তবু মোট বিক্রয়ের ভিত্তিতে কোম্পানিকে ভারী টার্নওভার ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়েছে। ফলে পরিচালন আয়ে ঘাটতি থাকলেও বড় অঙ্কের করের খরচ বইতে হচ্ছে।