![]()
ইবি রিপোর্ট
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প এখন নানা সংকটে। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন, কারখানায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সড়ক অবরোধে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। গত চার দিনে ৬৭০টি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। কর্মস্থলে যেতে না পেরে ঘরে ফিরেছেন ১৬ লাখ ৮০ হাজারের বেশি শ্রমিক। এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিক অসন্তোষের আড়ালে দেশি-বিদেশি কোনো মহল পরিকল্পিতভাবে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারও এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সোমবার বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, কিছু শিল্পমালিকও এই অস্থিরতার সঙ্গে জড়িত। তাদের কয়েকজন সাবেক সরকারের সময়ে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা সংসদ সদস্য ছিলেন। সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে এই শিল্পে। ফলে কারখানার উৎপাদন দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের জীবিকা, রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে চাপ তৈরি হতে পারে। বিদেশি ক্রেতারা অন্য দেশের দিকে ঝুঁকলে বাংলাদেশের ক্রয়াদেশও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও অস্থিরতার কারণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শ্রমিকদের স্বাভাবিক দাবির বাইরে কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সরকারের অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষ শ্রমিকদের ব্যবহার করে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করছে। মালিকদের একাংশের দাবি, কারখানায় হামলা ও ভাঙচুরে বহিরাগতরাও অংশ নিয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
যা বলছেন মন্ত্রীরা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমাদের কাছে তথ্য আছে, এই সহিংস আন্দোলনের সঙ্গে প্রকৃত কোনো শ্রমিক বা সত্যিকারের শ্রমিক সংগঠন জড়িত নয়। রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি শ্রমিকদের ব্যবহার করে সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়েছে। এই অস্থিরতার পেছনে সীমান্তের ওপার থেকে ইন্ধন জোগানো হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য এবং কিছু শ্রমিক সংগঠনের নেতার বিরুদ্ধে উসকানির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারখানা চালু রেখে উৎপাদন অব্যাহত রাখার জন্য মালিকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ডিসেম্বর সামনে রেখে পোশাক খাতে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে। বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা হবে।
রাজনীতিক ও শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান অভিযোগ করেছেন, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে কাজে লাগিয়ে পোশাকশিল্প ধ্বংসের চেষ্টা চলছে। সোমবার সকালে ফেসবুক পোস্টে তিনি সরকারকে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি নিয়ে আন্দোলন করার অধিকার রয়েছে। তবে আন্দোলনের মধ্যে ষড়যন্ত্রকারীরা থাকলে তাদের শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে গিয়ে যেন নতুন করে উত্তেজনা না ছড়ায়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তার মতে, শ্রমিকদের দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। তবে হামলা ও ভাঙচুরের কারণে বিদেশি ক্রেতারা অন্য দেশের দিকে চলে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন শ্রমিকরাই।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, অস্থিরতার পেছনে মজুরি নিয়ে অসন্তোষের পাশাপাশি সরকারকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনাও থাকতে পারে। ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি দেওয়ার সামর্থ্য অনেক কারখানার নেই। এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবুও মনে করেন, মজুরি নিয়ে অসন্তোষের বাইরে অন্য উদ্দেশ্য থাকতে পারে। নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিকদের একাংশ কাজে না ফেরা এবং কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, শ্রমিকদের প্রধান দাবি বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মাসিক মজুরি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কার্যকর হওয়া মজুরি কাঠামোর পর জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে বলে দাবি শ্রমিকদের। পাশাপাশি চাকরিচ্যুতদের পুনর্বহাল এবং কালোতালিকাভুক্তির প্রথা বন্ধের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
পাঠকের মন্তব্য