![]()
ইবি রিপোর্ট
চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা দেশের আমদানি ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। চট্টগ্রাম কাস্টমসের ‘টাইম রিলিজ স্টাডি’ (টিআরএস) অনুযায়ী, বন্দরে পণ্য খালাসে গড়ে ১১ দিন ৬ ঘণ্টা সময় লাগে। এই বিলম্বের কারণে বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে বলে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া সংক্রান্ত একটি খসড়া দলিলে উল্লেখ করা হয়েছে।
খালাসে দীর্ঘ সময় লাগায় আমদানিকারকদের ডেমারেজ বা বিলম্ব মাশুল দিতে হচ্ছে। প্রথম চার দিন বিনা মূল্যে কনটেইনার রাখার সুযোগের পরবর্তী সাত দিনে প্রতি টিইইউ কনটেইনারের জন্য দৈনিক ৬.৯০ ডলার মাশুল দিতে হয়। ১১ দিনের হিসাবে ডেমারেজ দাঁড়ায় ৪৮.৩০ ডলার বা প্রায় ৫ হাজার ৯৬৫ টাকা। এর সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত হলে ব্যয় হয় ৬ হাজার ৮৬০ টাকা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমদানিকারকেরা অতিরিক্ত খরচ পণ্যের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে যোগ করেন। ফলে এর চাপ পড়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ে। আমদানিকারক ইয়াসির আরাফাতের ভাষ্য, “এই বিলম্ব শুধু যে বন্দরের ডেমারেজ বাড়ায় তা নয়, প্রতিদিনের বিলম্বের কারণে আমাদের ব্যাংক ঋণের সুদও বাড়ে।”
কাস্টমসের গবেষণায় বলা হয়েছে, পণ্য খালাসে মোট সময়ের ৭৫ শতাংশ ব্যয় হয় আমদানিকারক ও তাঁদের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের প্রক্রিয়ায়। বন্দর কর্তৃপক্ষের লাগে ১৪ শতাংশ, কাস্টমসের মূল্যায়নে ৮ শতাংশ, অন্যান্য সরকারি সংস্থার ২ শতাংশ এবং শিপিং এজেন্টদের ১ শতাংশ সময়।
তবে হিসাবের পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন কাস্টমস এজেন্টরা। তাঁদের মতে, শিপিং এজেন্টরা জাহাজ বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশের আগেই ইমপোর্ট জেনারেল ম্যানিফেস্ট (আইজিএম) জমা দেন। তাই পণ্য খালাসের সময় গণনা শুরু হওয়া উচিত জাহাজ বন্দরে নোঙর করার পর থেকে। চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. শওকত আলী বলেন, “অনেক ক্ষেত্রেই জাহাজ সমুদ্রে থাকা অবস্থাতেই আমরা বিল অব এন্ট্রি সম্পন্ন করে রাখি। ফলে আইজিএম দাখিল থেকে ঘড়ির কাঁটা চালু করলে তা খালাসের প্রকৃত সময় প্রতিফলিত করবে না।”
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক এ সমস্যা সমাধানে কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ, এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে বসার আহ্বান জানিয়েছেন।
এনবিআর চেয়ারম্যানকে পাঠানো চিঠিতে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, বর্তমানে ৭৭ শতাংশ বিল অব এন্ট্রি এক দিনে এবং ৮৮ থেকে ৯০ শতাংশ তিন দিনের মধ্যে শুল্কায়ন করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, আইজিএম জমা থেকে পণ্য বুঝে নেওয়া পর্যন্ত মোট সময়ের ৯০ শতাংশের বেশি ব্যয় করেন আমদানিকারক ও তাঁদের প্রতিনিধিরা। এ পরিস্থিতিতে কাস্টমস আইন ২০২৩-এর ৮৪ ধারা অনুযায়ী পণ্য বন্দরে নামার পাঁচ দিনের মধ্যে আমদানি ঘোষণা দাখিলের সময়সীমা কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
গবেষণায় দেখা গেছে, রেড চ্যানেলে কায়িক পরীক্ষার মাধ্যমে খালাসে গড়ে ১৯ দিন ২৩ ঘণ্টা লাগলেও এ পথে যায় মোট চালানের ৮.৯৯ শতাংশ। অন্যদিকে, ইয়েলো চ্যানেলে নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রক্রিয়াকৃত ৯১.০১ শতাংশ চালান ছাড় করতে লাগে ১০ দিন ২০ ঘণ্টা।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুনে ২ লাখ ৭৮ হাজার ৭৩২টি কনটেইনার স্ক্যান করে ১৯৯টিতে সন্দেহজনক বিষয় পাওয়া যায়। পরে কায়িক পরীক্ষায় ৮১টি কনটেইনারে অনিয়ম ধরা পড়ে।
২০২২ সালের এনবিআর গবেষণাতেও পণ্য খালাসে গড়ে ১১ দিন ৬ ঘণ্টা ২৩ মিনিট লাগার তথ্য উঠে এসেছিল। এতে জাহাজ আসার আগেই নথি শুল্কায়নের ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়। যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসিং চালু হলে খালাসের সময় ১৩.৩ দিন থেকে কমে ৩.৯ দিনে আসতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর’ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল নোটিফিকেশন, ই-অকশন প্ল্যাটফর্ম এবং ব্যাংকিং তথ্যের অনলাইন সংযোগ চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য