![]()
ইবি রিপোর্ট
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দাম অনুযায়ী ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কেনার কথা ১ হাজার ৮৩৭ টাকায়। কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের গুনতে হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। দাম বাড়ানোর পরও নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস না পাওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে ভোক্তাদের মধ্যে। এ পরিস্থিতির জন্য আমদানিকারক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা পরস্পরকে দায়ী করছেন। অন্যদিকে, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে কয়েকটি কোম্পানির বিরুদ্ধে।
মন্ত্রণালয়, বিইআরসি ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩২ থেকে ৩৩টি কোম্পানির এলপিজি আমদানির লাইসেন্স বা অনুমোদন থাকলেও নিয়মিত আমদানি করে ১০ থেকে ১২টি কোম্পানি। বছরে দেশে এলপিজির চাহিদা প্রায় ১৭ থেকে ১৮ লাখ টন। এর প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় বাসাবাড়ির রান্নার কাজে। দেশের প্রায় ১ কোটি গ্রাহক এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ১২ শতাংশ, যানবাহনে ৫ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে ৩ শতাংশ এলপিজি ব্যবহৃত হয়। মোট চাহিদার প্রায় ৯৯ শতাংশ সরবরাহ করে বেসরকারি খাত; সরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশ মাত্র ১ শতাংশ।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। সেপ্টেম্বরে এ পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন। আমদানি কমার তথ্য না থাকলেও সংকট নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর গোয়েন্দা তথ্যে পাঁচটি কোম্পানির বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ আসে। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০ সেপ্টেম্বর থেকে কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমাতে শুরু করে। প্রথমে ৩০ শতাংশ কমানো হলেও পরে তা ৫০ শতাংশের বেশি করা হয়। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। দাম বাড়ানোর পরও বাজারে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আমিরুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমদানি কমেনি। বেশি দামে বিক্রি বন্ধ করতে সংগঠনটি আগেই নির্দেশ দিয়েছে। এরপরও কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা সরকারকে খুঁজে বের করতে হবে। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের বিষয়ে অনুসন্ধানের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, আমদানিকারকদের কেউ মজুদ করে থাকলে সরকার তা এক সেকেন্ডেই বের করতে পারে।
দেশে এলপিজি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ডিলারের সংখ্যা আনুমানিক ২০ হাজার। তারা বিভিন্ন অপারেটর কোম্পানি থেকে সিলিন্ডার নিয়ে পাইকারি দামে বিক্রি করেন। বিইআরসির নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার অপারেটরের কাছ থেকে ডিলারের কেনার দাম ১ হাজার ৭৪২ টাকা। ডিলারের মুনাফা ৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার জন্য বরাদ্দ ৪০ টাকা। সব মিলিয়ে ভোক্তার জন্য নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা।
তবে ডিলারদের অভিযোগ, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। অনেকেই পুরো মাসে চাহিদার অর্ধেক গ্যাস পেয়েছেন। এক ডিলার জানান, গ্রিন এলপিজি ১৮ সেপ্টেম্বরের পর তাকে আর গ্যাস সরবরাহ করেনি। নতুন দাম নির্ধারণের পর সিলিন্ডারপ্রতি ১ হাজার ৯৯০ টাকা দর দেওয়া হয়েছে, যেখানে তার কেনার কথা ১ হাজার ৭৪২ টাকায়। তার গাড়ি কয়েক দিন ধরে মোংলায় আটকে থাকায় অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। ২০ হাজার সিলিন্ডার পাওয়ার কথা থাকলেও তিনি পেয়েছেন সর্বোচ্চ দুই হাজার। বাড়তি ব্যয় সামলাতে পাইকারি দাম ২ হাজার ২০০ টাকা চাওয়ার কথা জানান তিনি। তার দাবি, নির্ধারিত ৫০ টাকা মুনাফার বদলে ২১০ টাকা না রাখলে খরচ পোষানো সম্ভব হচ্ছে না।
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি সেলিম খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ৩০ থেকে ৩২টি কোম্পানির লাইসেন্স থাকলেও পাঁচ থেকে ছয়টি কোম্পানি সিলিন্ডার সরবরাহ করছে। প্রতিষ্ঠানভেদে তাদের ১ হাজার ৭৫০ থেকে ২ হাজার টাকা দরে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। বিষয়টি বিইআরসি ও মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে ১২ অক্টোবর সংগঠনের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে পরিস্থিতি তুলে ধরা হবে বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, ডিলার বা পরিবেশকদের কাছে পর্যাপ্ত সিলিন্ডার নেই। কারা মজুদ করে রেখেছে, সে তথ্য বিইআরসি ও মন্ত্রণালয়ের কাছে থাকার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ তিনি জানেন না।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, পর্যাপ্ত জনবল ও নির্বাহী ক্ষমতা না থাকায় মাঠপর্যায়ে সরাসরি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জটিল ও সংবেদনশীল। তবে আমদানির দৈনিক হিসাব সংগ্রহ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে।
রাজধানীর খিলগাঁও তিলপাপাড়ার স্কুলশিক্ষিকা শিউলী ইকবাল জানান, আগে ফোন করলেই বাসায় সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়া হতো। কিন্তু গত সোমবার ফোন করে গ্যাস না পাওয়ার কথা জানতে পারেন। তাকে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯৫০ টাকা দিতে বলা হয়। নিরুপায় হয়ে তিনি সেই দামেই সিলিন্ডার কেনেন। খিলগাঁও জোরপুকুর এলাকার এক খুচরা বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দিনে ৪০টি সিলিন্ডার চাইলেও পাওয়া যাচ্ছে ২০টি। তার দোকানে ১২ কেজির প্রতিটি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ টাকায়।
জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন বিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যাবে, এমনটা সরকারও মনে করছে না। তবে জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং বাজার পর্যবেক্ষণের পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অবৈধ মজুদ, কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দামে বিক্রি ঠেকাতে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছেন জেলা প্রশাসকরা। আমদানিকারক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সরবরাহের প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নির্ধারিত দামে বিক্রি নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানও জোরদার করা হয়েছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এখন রাতারাতি আমদানি বাড়ানো সম্ভব নয়, তবে আগেই পর্যাপ্ত আমদানি হয়েছে। তার মতে, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হয়েছে। কারা গ্যাস মজুদ করেছে, তা তদন্ত করে দায়ী কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করা উচিত।
পাঠকের মন্তব্য