
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর এশিয়ায় পরিশোধিত জ্বালানির আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ এশিয়ার দেশগুলোতে ব্যবহৃত হলেও চলমান সংঘাত ও সরবরাহ সংকটের কারণে এসব দেশে দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি আমদানি কমেছে। ফলে অনেক দেশ এখন নিজেদের মজুত জ্বালানি ব্যবহার করে চাহিদা পূরণের চেষ্টা করছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
পণ্যবাজার বিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে এশিয়ায় পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির পরিমাণ কমে দৈনিক ৫১ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ে এই পরিমাণ ছিল দৈনিক ৫৬ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানে হামলা শুরুর আগের তিন মাসে এশিয়ায় পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির গড় ছিল দৈনিক ৭০ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল। সেই তুলনায় বর্তমান আমদানি প্রায় ১৯ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল কমেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহে বড় ধাক্কা
এশিয়ার জ্বালানি বাজারে এই পতনের অন্যতম প্রধান কারণ মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ তাদের প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহের ওপর নির্ভর করে।
বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর এশিয়ার চাহিদা পূরণের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি সরবরাহ করতে পারছে না। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অব্যাহত হামলা এবং জ্বালানি পরিবহনে ব্যবহৃত জাহাজের তীব্র সংকটের কারণে সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। ফলে প্রণালিটিতে নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে এশিয়ার জ্বালানি বাজারে।
মজুত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে
আমদানি কমে যাওয়ায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এখন নিজেদের মজুত জ্বালানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে দেশগুলোর কৌশলগত ও বাণিজ্যিক জ্বালানি মজুতের ওপর চাপ বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ সংকট দীর্ঘায়িত হলে মজুত দ্রুত কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরও অস্থির হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিনির্ভর এশীয় দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে। কারণ আমদানি কমার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় ও জাহাজভাড়াও বাড়তে পারে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহন এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাহাজ সংকটে ব্যাহত সরবরাহ
এশিয়ামুখী জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে বর্তমানে জাহাজের তীব্র সংকটও বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের কারণে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি পরিবহনকারী জাহাজের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক জাহাজকে বিকল্প পথে চলতে হচ্ছে, যার ফলে সময় ও পরিবহন ব্যয় উভয়ই বাড়ছে।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালিতে হামলার কারণে জাহাজ মালিক ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকি বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে জ্বালানি পরিবহনের সামগ্রিক সক্ষমতার ওপর।
ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর হাতে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা এশিয়ার বাজারে স্বাভাবিক গতিতে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।
এশিয়ার জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি ব্যবহারকারী অঞ্চল এশিয়া। চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শিল্প ও পরিবহন ব্যবস্থা বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ কমে গেলে এসব দেশের বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের প্রয়োজন হতে পারে। এতে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং দাম বৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের মজুত ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে জ্বালানি সরবরাহ সংকট আরও গভীর হতে পারে।
এ অবস্থায় যুদ্ধের গতিপথ, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং জ্বালানি পরিবহনকারী জাহাজের চলাচল—এই তিনটি বিষয়ই এশিয়ার জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাঠকের মন্তব্য