
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
জ্বালানি সংকট, উৎপাদনে স্থবিরতা, দুর্বল রাজস্ব আহরণ এবং টানা চার বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে বেসরকারি খাত যখন কঠিন সময় পার করছে, ঠিক তখনই সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়িয়ে নবম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন করা হয়েছে।
নতুন এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে সব ধরনের ভাতা একযোগে কার্যকর হলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতে সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ২ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাবে। এই অঙ্ক গত অর্থবছরে সরকারের মোট আহরিত রাজস্বের প্রায় অর্ধেকের সমান।
সর্বনিম্ন গ্রেডে ১৪২ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি
নতুন বেতন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের কর্মীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। অষ্টম শ্রেণি পাস যোগ্যতায় নিয়োগ পাওয়া এসব কর্মীর বর্তমান মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার ১০ টাকা হবে।
তবে নতুন কাঠামোয় ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। মূল বেতনের সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত ও মোবাইল ফোন ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা যুক্ত হলে এই গ্রেডের একজন কর্মীর মোট মাসিক আয় প্রায় ৩৫ হাজার টাকায় দাঁড়াতে পারে।
গত ১৭ বছরে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৪৮৮ শতাংশ।
সর্বোচ্চ গ্রেডে বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা
নতুন বেতন কাঠামোয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের গ্রেড-১ কর্মকর্তাদের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে দ্বিগুণ করে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণত সচিবরা এই গ্রেডের আওতাভুক্ত।
২০০৯ সালে গ্রেড-১ কর্মকর্তাদের মূল বেতন ছিল ৪০ হাজার টাকা। সে হিসাবে প্রায় দেড় দশকে তাদের মূল বেতন বেড়েছে ২৯০ শতাংশ।
অন্যদিকে বিসিএস ক্যাডার এবং নন-ক্যাডার প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তারা সাধারণত নবম গ্রেডে যোগ দেন। ২০০৯ সালে এই গ্রেডের মূল বেতন ছিল ১১ হাজার টাকা। ২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোয় তা দ্বিগুণ হয়ে ২২ হাজার টাকা হয়েছিল। এবার নবম পে স্কেলে নবম গ্রেডের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৪ হাজার টাকা।
অর্থাৎ ২০০৯ সালের তুলনায় এই গ্রেডের মূল বেতন বেড়েছে ৩০০ শতাংশ।
ধাপে ধাপে কার্যকর হবে নতুন বেতন কাঠামো
সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নতুন বেতন কাঠামো একবারে পুরোপুরি কার্যকর করা হচ্ছে না। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত তিন ধাপে মূল বেতন কার্যকর করা হবে। এরপর ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সব ধরনের ভাতা একযোগে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর ফলে গত জুলাই থেকে অবসরে যাওয়া সরকারি চাকরিজীবীরাও নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় পেনশন সুবিধা পাবেন।
সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি সাংবাদিকদের জানান, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনমান এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও যৌক্তিক বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন করা হয়েছে।
আর্থিক সংকটের মধ্যেও অনুমোদন
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সরকারের আর্থিক সংকট এবং বাড়তি দামে জ্বালানি আমদানির অর্থের সংস্থান নিয়ে চাপের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন নিয়ে মন্ত্রিসভায় কয়েকজন মন্ত্রী আপত্তি জানিয়েছিলেন।
তবে মন্ত্রীদের বক্তব্য শোনার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রস্তাবটিতে অনুমোদন দেন।
নতুন বেতন কাঠামোর ফলে সরকারের ওপর বড় ধরনের অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হলেও সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের বেতন-ভাতা সমন্বয়ের দাবির বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও সাংবাদিকদের বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেই
নতুন পে স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা অন্তর্ভুক্ত হবেন কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, এ মুহূর্তে তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। বিষয়টি চূড়ান্ত বা নিষ্পত্তি হলে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
সাংবাদিকদের বেতন নিয়ে সরকারের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।
‘বেসরকারি খাতে বেতন বৃদ্ধির চাপ তৈরি হবে না’
নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হলে বেসরকারি খাতে মজুরি ও বেতন বাড়ানোর বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে না বলে মনে করেন সরকার নিযুক্ত এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুর রহমান।
তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে কর্মরতরা জানেন যে তাদের কোম্পানিগুলো স্থবির অবস্থায় রয়েছে। তার ওপর সরকার যেহেতু ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করবে, তাই এতে মূল্যস্ফীতি খুব একটা বাড়বে না। ফলে বেসরকারি খাতও বেতন বৃদ্ধির বড় চাপের মুখে পড়বে না।
সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশনে বড় পরিবর্তন
নতুন বেতন কাঠামোর পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশনেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। দীর্ঘদিন আগে কম মূল বেতনে অবসরে যাওয়া কর্মীরা একই পদ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় অনেক কম পেনশন পাচ্ছেন। তাদের আর্থিক সুবিধা বাড়াতে মাসিক নিট পেনশনের পরিমাণ সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—
- মাসিক পেনশন ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে ১০০ শতাংশ বাড়বে।
- ৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে ৭৫ শতাংশ বাড়বে।
- ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে ৬৫ শতাংশ বাড়বে।
- ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে ৬০ শতাংশ বাড়বে।
- ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হবে।
এ ছাড়া যেসব সরকারি চাকরিজীবীর প্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে, তারা প্রতিটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা পাবেন।
এতদিন পঞ্চম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তারা মোবাইল ফোন ভাতা পেতেন। নতুন কাঠামোয় সব সরকারি চাকরিজীবীকে এই ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
‘এক পদ, এক পেনশন’ ব্যবস্থা
নতুন বেতন কাঠামোয় সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রেই ‘ওয়ান র্যাংক, ওয়ান পেনশন’ বা ‘এক পদ, এক পেনশন’ ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে।
বর্তমানে কোনো সামরিক কর্মকর্তা বেসামরিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেলে দুই জায়গা থেকেই পেনশন সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। একই ধরনের সুবিধা বেসামরিক কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
নতুন ব্যবস্থায় এই দ্বৈত পেনশন সুবিধা বাতিল করে এক পদে এক পেনশন ব্যবস্থা চালু করা হবে। তবে ২০১৯ সালের আগের বেসামরিক অবসরভোগীদের তথ্য না থাকায় ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এই ব্যবস্থা কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মহার্ঘ ভাতা থেকে নতুন পে স্কেল
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আলোচনা শুরু হয়েছিল মূলত মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার উদ্যোগ থেকে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর চাকরিজীবীদের আন্দোলনের মুখে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল।
তবে রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে শতাধিক পণ্যে ভ্যাট বাড়ানোর পর ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার।
এরপর সরকারি চাকরিজীবীদের পক্ষ থেকে নতুন করে বড় কোনো দাবি না থাকলেও নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের জন্য পে কমিশন গঠন করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত কমিশন গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক দিন আগে নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ করে। সেখানে গ্রেড-১-এ সর্বনিম্ন ১০০ শতাংশ এবং ২০তম গ্রেডে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছিল।
তবে অন্তর্বর্তী সরকার সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন না করে নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে যায়। এর ফলে নতুন সরকারের ওপর পে স্কেল বাস্তবায়নের চাপ তৈরি হয়।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ছিল। তবে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় দুই বছরে চার ধাপে এটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
২০১৫ সালের বেতন কাঠামো থেকে কী শিক্ষা
২০১৫ সালে ড. ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন পে কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন শতভাগ বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। পাশাপাশি প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।
ওই কমিশনের সুপারিশে ভবিষ্যতে আর পে কমিশন গঠন না করার কথাও বলা হয়েছিল। কোনো বছর মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের বেশি হলে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইনক্রিমেন্টের হার নির্ধারণের প্রস্তাব ছিল।
এ ছাড়া টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল করে দীর্ঘদিন পদোন্নতি না পাওয়া কর্মকর্তাদের ১০ বছর পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী গ্রেডে উন্নীত করার সুপারিশও করা হয়েছিল।
তবে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট সমন্বয়ের প্রস্তাব বাস্তবে কার্যকর হয়নি।
ওই সময়ের অর্থসচিব ড. মাহবুব আহমেদ বলেন, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে ইনক্রিমেন্ট সমন্বয়ের জন্য অর্থ বিভাগে একটি ছোট উইং রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তারা মূল্যস্ফীতি হিসাব করে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের সুপারিশ করার কথা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি।
বেতন বাড়লেই কি কমবে দুর্নীতি?
২০১৫ সালে শতভাগ বেতন বাড়িয়ে অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সময় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে দুর্নীতির প্রবণতা কমবে এবং প্রশাসনে গতি ফিরবে।
তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে ভিন্ন মত দিয়েছেন ওই সময়ের অর্থসচিব ড. মাহবুব আহমেদ। তার মতে, শতভাগ বেতন বৃদ্ধির পরও দুর্নীতি কমেনি, বরং বেড়েছে।
তবে তিনি মনে করেন, দুর্নীতির সঙ্গে বেতন কাঠামো দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়টি সরাসরি তুলনা করা ঠিক নয়। কারণ প্রশাসনে অনেক সৎ কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত নন। তাদের দীর্ঘ সময় একই বেতন কাঠামোয় রাখা যৌক্তিক নয়।
বাড়তি ব্যয় নিয়ে অর্থনীতিতে প্রশ্ন
নতুন পে স্কেলে সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে এবং ভোগের পরিমাণও বাড়তে পারে। এর ফলে অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ওপরও কিছুটা চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে বেতন বাড়লেই যে মূল্যস্ফীতি অবশ্যই বাড়বে—এমন সরল সমীকরণ নেই। এর প্রভাব নির্ভর করবে বাড়তি ব্যয়ের অর্থ কীভাবে জোগান দেওয়া হচ্ছে, বাজারে পণ্য ও সেবার সরবরাহ কেমন, মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে কী ধরনের সমন্বয় রয়েছে—এসব বিষয়ের ওপর।
রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ, অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধি অথবা উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে বেতন-ভাতা বাড়ানো হলে অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ বাড়ানো গেলে এবং রাজস্ব আহরণ শক্তিশালী করা গেলে বাড়তি চাহিদার নেতিবাচক প্রভাব কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব।
বেসরকারি খাতের কর্মীদের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির যৌক্তিকতা থাকলেও দেশের বিপুলসংখ্যক বেসরকারি চাকরিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের আয় একই হারে বাড়ছে না। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট, উৎপাদন কমে যাওয়া, ব্যবসায়িক স্থবিরতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বেসরকারি খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানই চাপের মধ্যে রয়েছে।
ফলে সরকারি ও বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় ও সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিভিন্ন খাতে মজুরি নির্ধারণের জন্য ওয়েজ বোর্ডসহ নানা ব্যবস্থা থাকলেও সেগুলো নিয়মিত হালনাগাদ এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। সাংবাদিকদের জন্যও ওয়েজ বোর্ড রয়েছে, কিন্তু তার বাস্তবায়ন অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল।
সরকারি ও বেসরকারি খাতের বেতন কাঠামো একইভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে ন্যূনতম মজুরি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বিভিন্ন পেশার আয় কাঠামোর মধ্যে একটি যৌক্তিক সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন।
দক্ষতা বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—বাড়তি ব্যয়ের বিনিময়ে সরকারি সেবার মান ও কর্মদক্ষতা কতটা বাড়বে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়লেও যদি কাজের গতি, উৎপাদনশীলতা, জনসেবা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা না বাড়ে, তাহলে রাষ্ট্রের এই অতিরিক্ত ব্যয় থেকে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
অন্যদিকে বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে যদি কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়ে, প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আসে এবং অপচয় ও দুর্নীতি কমে, তাহলে সরকারের অর্থও সাশ্রয় হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অর্থনীতিতে নতুন পে স্কেলের নেতিবাচক প্রভাবও তুলনামূলকভাবে সীমিত রাখা সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে দীর্ঘ সময় পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় ধরনের বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। নিম্ন গ্রেডের কর্মীদের বেতন ও পুরোনো পেনশনভোগীদের সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বেতনও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। তবে এই বিশাল অতিরিক্ত ব্যয় কীভাবে সামাল দেওয়া হবে এবং এর সুফল কতটা জনসেবা ও অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতায় প্রতিফলিত হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
পাঠকের মন্তব্য