
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল সহজ করতে একটি নতুন অস্থায়ী নৌপথ চালুর বিষয়ে একমত হয়েছে ইরান ও ওমান। তবে এই সমঝোতার মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ পুরোপুরি খুলে দেওয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছে তেহরান। ইরানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, গত জুনে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতি পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত করা হবে না।
মঙ্গলবার ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি এ অবস্থানের কথা জানান। এর আগে তেহরানে ইরান ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে ধাপে ধাপে একটি কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকে অস্থায়ী নৌপথ চালু এবং প্রণালির কিছু এলাকায় মাইন অপসারণের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে ঘারিবাবাদি জানান, ইরান ও ওমান যে ট্রানজিট রুটে একমত হয়েছে, সেটি স্থায়ী কোনো নৌপথ নয়; বরং একটি অস্থায়ী রুট। এই নৌপথের প্রবেশপথ ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়ে যাবে। একইভাবে বের হওয়ার পথের একটি অংশও ইরানের জলসীমার মধ্যে থাকবে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন নৌপথটির প্রস্থ হবে প্রায় ৭ মাইল বা ১১ দশমিক ৩ কিলোমিটার।
পুরোপুরি খুলছে না হরমুজ
নতুন নৌপথ চালুর বিষয়ে সমঝোতা হলেও এটিকে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে না ইরান। ঘারিবাবাদি স্পষ্ট করে বলেছেন, অস্থায়ী এই রুট চালুর বিষয়টি প্রণালির পূর্ণাঙ্গ উন্মুক্ততার সমতুল্য নয়।
ইরানের অবস্থান হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে আগে জুনে করা অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তির আওতায় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করতে হবে। এরপরই হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা ও পূর্ণাঙ্গভাবে জাহাজ চলাচলের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
তেহরানে বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি অস্থায়ী নৌপথ চালুর পাশাপাশি হরমুজ থেকে মাইন অপসারণের পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা করেন।
বদর আলবুসাইদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় আশা প্রকাশ করেছেন, দুই দেশ শিগগিরই নতুন নৌপথটির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে পারবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা এবং একটি স্থায়ী সমাধানের বিষয়েও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতেও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার জন্য প্রযুক্তিগত আলোচনা চালানোর কথা বলা হয়েছে। এসব আলোচনায় তথ্য আদান-প্রদান, জাহাজ চলাচল এবং নিরাপত্তাসেবা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সংঘাতের কেন্দ্রে হরমুজ
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে নতুন করে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ইরান প্রণালির জাহাজ চলাচল সীমিত করার পর বিকল্প নৌপথ ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ইরানের দাবি ছিল, হরমুজের আন্তর্জাতিক নৌপথের কিছু এলাকায় মাইন পেতে রাখা হয়েছে। এ কারণে নিরাপদ জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন রুট তৈরির প্রয়োজন দেখা দেয়।
জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ স্বাক্ষরের পর ওমান ও আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও), যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে হরমুজে ওমানের উপকূলঘেঁষা একটি নতুন নৌপথ ঘোষণা করে। তবে ওই রুট নিয়ে ইরানের আপত্তি ছিল।
তেহরানের অভিযোগ ছিল, তথাকথিত দক্ষিণের নৌপথটি তাদের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা লঙ্ঘন করছে। ওই রুট ব্যবহারকারী একটি জাহাজে ইরানের হামলার পর অন্তর্বর্তী চুক্তিটি ভেঙে পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর বৃহত্তর শান্তিচুক্তির জন্য কূটনৈতিক তৎপরতাও কার্যত স্থবির হয়ে যায়।
মাইন অপসারণ নিয়েও মতবিরোধ
হরমুজ প্রণালিতে মাইন থাকার বিষয়টিও এখনো বড় উদ্বেগের কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রণালির আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকা সব মাইন অপসারণ করা হয়েছে বলে দাবি করলেও ইরান তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘারিবাবাদি ট্রাম্পের বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, বাজারকে শান্ত রাখার উদ্দেশ্যেই এমন দাবি করা হয়েছে।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মাইন শনাক্তকারী জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালির এলাকায় প্রবেশ করলে সেগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
ফলে ইরান-ওমানের মধ্যে অস্থায়ী নৌপথ চালুর সমঝোতা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। নতুন নৌপথটি কতটা কার্যকর হবে, মাইন অপসারণের কাজ কীভাবে এগোবে এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সমঝোতা কতটা সফল হবে—এসব বিষয়ের ওপরই হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক জাহাজ চলাচলের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে।
পাঠকের মন্তব্য