
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
একসময় বাংলাদেশের করপোরেট অঙ্গনের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত বেক্সিমকো গ্রুপ এখন বড় ধরনের আর্থিক, প্রশাসনিক ও পরিচালন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গ্রুপটির অধিকাংশ শিল্পকারখানা বন্ধ বা সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে শত শত প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া রয়েছে।
সাফল্যের সময় বেক্সিমকো গ্রুপে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ কর্মরত ছিলেন। টেক্সটাইল, ওষুধ, সিরামিক, আবাসন, নির্মাণ, জ্বালানি, গণমাধ্যম ও আর্থিক সেবাসহ বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত ছিল প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গ্রুপটির ব্যবসায় বড় ধরনের ধাক্কা আসে। বর্তমানে গ্রুপটির করপোরেট কার্যালয় ও অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে আগের সেই কর্মচাঞ্চল্য নেই।
গ্রুপটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি মূলধনের সংকট, ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ থাকা, ঋণের চাপ, কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা এবং আইনি ও প্রশাসনিক সমস্যার কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
অধিকাংশ কারখানা বন্ধ
বেক্সিমকোর সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে টেক্সটাইল খাতে। গাজীপুরের বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের প্রায় ১৫টি টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ রয়েছে। ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ থাকায় কাঁচামাল আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ঋণপত্র বা এলসি খোলা সম্ভব না হওয়াকে কারখানা বন্ধের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে প্রায় ৪৪ হাজার শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়। তাদের বিধিবদ্ধ পাওনা পরিশোধ করা হলেও প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে বেতন না পাওয়ায় চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন।
প্রায় ২ হাজার প্রশাসনিক কর্মকর্তার মধ্যে বর্তমানে ৫০০ জনেরও কম কর্মী বিভিন্ন স্থাপনা ও সীমিত কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। পাশাপাশি অল্পসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী বন্ধ কারখানাগুলো পাহারা দিচ্ছেন।
বেতন বকেয়া কর্মকর্তাদের দুর্ভোগ
ধানমন্ডিতে অবস্থিত বেক্সিমকো গ্রুপের ১৪ তলা বেল টাওয়ার একসময় ছিল কর্মচাঞ্চল্যে ভরা। বর্তমানে সেই কার্যালয়ের অনেক অংশই প্রায় জনশূন্য। সেখানে আসা অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রধান উদ্বেগ বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনা।
বেক্সিমকো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওসমান কায়সার চৌধুরী জানিয়েছেন, গ্রুপের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ থাকায় প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যমান মূলধনও স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৪ মাসের মধ্যে প্রায় ১২ মাসের বেতন তিনি নিজেও পাননি। কখনো অর্ধেক বেতন কিংবা কয়েক মাস পর একবার বেতন পাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাওয়া কাম্য নয়। মালিকপর্যায়ে ঋণ বা অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও এর প্রভাব যেন শ্রমিক ও প্রতিষ্ঠানকে পুরোপুরি অচল করে না দেয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ঋণের বোঝা ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি
বেক্সিমকোর সংকটের অন্যতম বড় কারণ বিশাল ঋণের বোঝা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, গ্রুপটির মোট ঋণের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের কাছেই বেক্সিমকোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৫ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঋণ জালিয়াতি, অর্থপাচার ও অনিয়মিত ঋণ গ্রহণের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনও গ্রুপটির সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেছে।
ঋণ আদায়ে বিভিন্ন উদ্যোগও নিয়েছে ব্যাংকগুলো। ২০২৪ সালের শেষ দিকে জনতা ব্যাংক বেক্সিমকোর কারখানা, জমি ও করপোরেট সদর দপ্তর নিলামে তুলে পাওনা আদায়ের চেষ্টা করেছিল। তবে ওই নিলামে কোনো ক্রেতা বা দরদাতা পাওয়া যায়নি।
বেক্সিমকো কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, মালিকদের নেওয়া ঋণ ও প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রমকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও আরও কমে যায় এবং একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায় নতুন অর্থায়নেও বাধা
বেক্সিমকোর সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে গ্রুপটির মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামো ঘিরে আইনি পরিস্থিতি। গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং চেয়ারম্যান এএসএফ রহমান দেশের বাইরে রয়েছেন।
ফলে নতুন অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় করপোরেট গভর্ন্যান্স, বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন কমপ্লায়েন্স নথি নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন গ্রুপটির কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ থাকায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। নতুন করে ঋণ বা বিনিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যাংক ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক নিশ্চয়তা চাইছে।
বেক্সিমকোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে তারা নিয়মিত আলোচনা করছে। বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে সরকারের সহযোগিতার প্রত্যাশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিদেশি বিনিয়োগের উদ্যোগও ভেস্তে যায়
বন্ধ টেক্সটাইল কারখানাগুলো পুনরায় চালুর জন্য বিদেশি অর্থায়নের একটি উদ্যোগ ২০২৫ সালে চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
জনতা ব্যাংক, জাপানি প্রতিষ্ঠান রিভাইভাল, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইকোমিলি এবং বেক্সিমকো গ্রুপের সমঝোতার মাধ্যমে ১৫টি টেক্সটাইল কারখানা পুনরায় চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। প্রস্তাব অনুযায়ী, রিভাইভালের মাধ্যমে প্রায় ২ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ছিল এবং এর ফলে ২৫ হাজারের বেশি কর্মীর কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল।
বেক্সিমকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পরও কারখানা চালুর ঠিক আগমুহূর্তে উদ্যোগটি বাতিল হয়ে যায়।
তার মতে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বন্ধ ও সংকটাপন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় সচল করার বিষয়ে যে গুরুত্ব দিচ্ছে, তাতে বেক্সিমকোর কারখানাগুলোও পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফার্মাসিউটিক্যালস এখনো শক্ত অবস্থানে
গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠান অবশ্য একই অবস্থায় নেই। বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস এখনো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে এবং পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে দেওয়া আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস প্রায় ৬৯৯ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেও প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা প্রায় ৭০৫ কোটি টাকা হয়েছে।
তবে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আইনি জটিলতা রয়েছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নিয়োগ দেওয়া স্বতন্ত্র পরিচালকদের বিষয়ে উচ্চ আদালতে করা রিটের কারণে প্রতিষ্ঠানটির পর্ষদ সভা নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছিল।
লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তি নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় পরবর্তী সময়ে বিশেষ অনুমোদনের মাধ্যমে পর্ষদ সভা আয়োজনের সুযোগ দেওয়া হয়।
শাইনপুকুর ও এলপিজি ইউনিট সীমিতভাবে চালু
বেক্সিমকোর আরেকটি প্রতিষ্ঠান শাইনপুকুর সিরামিকস আংশিকভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থায়ও চাপ রয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মুনাফা করলেও পরবর্তী সময়ে লোকসানের মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ ছাড়া বেক্সিমকো এলপিজি ইউনিট-১ সীমিত পরিসরে চালু রয়েছে। এলসি খুলতে না পারায় স্থানীয় উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
গ্রুপের অন্যান্য সেবা, আবাসন ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসাগুলোও স্বাভাবিক কার্যক্রম ধরে রাখতে নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।
তিস্তা সোলার পার্ক থেকে নিয়মিত আয়
বেক্সিমকোর কিছু কার্যক্রম এখনো রাজস্ব তৈরি করছে। এর মধ্যে রয়েছে তিস্তা সোলার পার্ক। ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে।
প্রকল্পটি প্রতি মাসে প্রায় ৫০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করলেও এর পুরোটা বেক্সিমকোর হাতে থাকে না। পরিচালন ব্যয় মেটাতে প্রায় ৫ থেকে ৭ কোটি টাকা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। বাকি অর্থ বিনিয়োগকারীদের পাওনা ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক দায় পরিশোধের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
পুঁজিবাজারেও আটকে আছে বিনিয়োগ
বেক্সিমকো গ্রুপের পুঁজিবাজারভিত্তিক বিনিয়োগও সংকটে রয়েছে। ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের শেয়ারে গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে।
সরকার পরিবর্তনের পর এসব প্রতিষ্ঠানে মনোনীত পরিচালক প্রত্যাহার করে নেয় বেক্সিমকো। তবে সংশ্লিষ্ট বিও হিসাব অবরুদ্ধ থাকায় শেয়ার বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করতে পারছে না গ্রুপটি।
একইভাবে বেক্সিমকো সিকিউরিটিজের কার্যক্রমও স্বাভাবিক হয়নি। পরিচালনা পর্ষদ ও প্রয়োজনীয় নথিপত্রসংক্রান্ত জটিলতার কারণে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স নবায়ন আটকে রয়েছে।
পুনরুজ্জীবনের অপেক্ষায় বেক্সিমকো
পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা বেক্সিমকো গ্রুপ বর্তমানে এমন এক সংকটে পড়েছে, যেখানে শুধু আর্থিক পুনর্গঠন নয়, একই সঙ্গে আইনি, প্রশাসনিক ও পরিচালন কাঠামোর সমাধান প্রয়োজন।
একদিকে বিপুল ঋণ ও আইনি অভিযোগ, অন্যদিকে ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ থাকায় চলতি মূলধনের সংকট—সব মিলিয়ে গ্রুপটির অধিকাংশ শিল্পকারখানা এখনো স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থান ও সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতের ওপর।
বেক্সিমকো কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, সরকার ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় পর্যায়ক্রমে কারখানাগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে। তবে সেই পুনরুজ্জীবন নির্ভর করছে ঋণ পুনর্গঠন, আইনি জটিলতার সমাধান, নতুন অর্থায়ন এবং কার্যকর করপোরেট ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর।
একসময় ৭০ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত এই শিল্পগোষ্ঠীর সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কীভাবে বন্ধ কারখানাগুলো আবার উৎপাদনে ফিরবে এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকট কাটিয়ে বেক্সিমকো নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবে।
পাঠকের মন্তব্য