
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বহুল ব্যবহৃত এইচ-১বি ভিসার ফি ১ লাখ ৩ হাজার ২৬৫ ডলার নির্ধারণ করে তা স্থায়ী করার প্রস্তাব দিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। এর আগে আদালত এই ফি আরোপকে অবৈধ ঘোষণা করে আদায় বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। এবার নতুন প্রস্তাবিত বিধিমালার মাধ্যমে ফি পুনরায় চালু ও স্থায়ী করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) এ-সংক্রান্ত প্রস্তাবিত বিধিমালা ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশ করে। প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হলে নতুন এইচ-১বি ভিসার ক্ষেত্রে ১ লাখ ৩ হাজার ২৬৫ ডলারের ফি স্থায়ীভাবে কার্যকর হতে পারে। বছরের শেষ নাগাদ বিধিমালাটি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন নিয়ম কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করতে আগ্রহী বিদেশি দক্ষ কর্মীদের খরচ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে বিদেশি কর্মী নিয়োগ দেওয়া মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বাড়তি ব্যয় বহন করতে হতে পারে।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে ভারতীয়দের ওপর
এইচ-১বি ভিসার নতুন ফি ভারতীয়দের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই ভিসার সুবিধাভোগীদের ৭০ শতাংশের বেশি ভারতীয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেসের (ইউএসসিআইএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোট ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৪০২টি এইচ-১বি আবেদন অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে ভারতীয় বংশোদ্ভূত সুবিধাভোগীর হার ছিল প্রায় ৭১ শতাংশ।
ফলে নতুন করে ১ লাখ ৩ হাজার ২৬৫ ডলারের ফি স্থায়ী হলে ভারতীয় দক্ষ কর্মী এবং তাদের নিয়োগ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এর বড় ধরনের আর্থিক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, শিক্ষা, গবেষণা ও অন্যান্য বিশেষায়িত খাতে বিদেশি কর্মী নিয়োগের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
আগে কয়েক হাজার ডলারের মধ্যে ছিল ফি
এইচ-১বি কর্মসূচির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়োগকর্তারা বিশেষায়িত ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ দিতে পারেন। প্রতি বছর সাধারণত ৬৫ হাজার এইচ-১বি ভিসা দেওয়া হয়। এর বাইরে উচ্চতর ডিগ্রিধারীদের জন্য আরও ২০ হাজার ভিসার সুযোগ রয়েছে।
সাধারণত এই ভিসার মেয়াদ তিন থেকে ছয় বছর হয়ে থাকে। ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ফি আরোপের আগে এইচ-১বি ভিসার জন্য বিভিন্ন ধরনের ফি মিলিয়ে খরচ সাধারণত প্রায় ২ হাজার থেকে ৫ হাজার ডলারের মধ্যে ছিল।
গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন প্রথমবারের মতো অস্থায়ীভাবে বিপুল পরিমাণ এই ফি আরোপ করে। এতে প্রযুক্তি, শিক্ষা, গবেষণাসহ বিদেশি দক্ষ কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল বিভিন্ন খাতে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে আগে থেকেই শিক্ষার্থী ভিসায় থাকা বিদেশি নাগরিকদের নতুন এইচ-১বি ভিসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ফি প্রযোজ্য হবে না। একইভাবে বিদ্যমান এইচ-১বি ভিসা নবায়নের ক্ষেত্রেও এই ফি কার্যকর হবে না বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতে চলছে আইনি লড়াই
এইচ-১বি ভিসার উচ্চ ফি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ইতোমধ্যে আইনি বিরোধ তৈরি হয়েছে। গত জুনে একজন ফেডারেল বিচারক এই ফি অবৈধ ঘোষণা করে ট্রাম্প প্রশাসনকে তা আদায় থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আদালতে শুনানি চলছে। এ ছাড়া অন্য একটি আদালতেও এই ফি নিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জ বিচারাধীন রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অস্থায়ীভাবে আরোপ করা ফি বৃদ্ধির মেয়াদ আগামী সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। এর আগেই নতুন প্রস্তাবিত বিধিমালা চূড়ান্ত হলে ১ লাখ ৩ হাজার ২৬৫ ডলারের ফি স্থায়ী করার সুযোগ তৈরি হবে।
আদালতে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত প্রায় ৭০টি নিয়োগকর্তা মোট ৮৫টি ভিসা আবেদনের জন্য ১ লাখ ডলারের ফি পরিশোধ করেছিল।
এইচ-১বি কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক
এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। ট্রাম্প ও কর্মসূচিটির সমালোচকদের অভিযোগ, অনেক মার্কিন প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম খরচে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করে এবং এর ফলে স্থানীয় মার্কিন কর্মীরা চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন।
অন্যদিকে ব্যবসায়ী সংগঠন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু খাতে প্রয়োজনীয় দক্ষ ও যোগ্য মার্কিন কর্মীর ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে প্রযুক্তি ও অন্যান্য বিশেষায়িত খাতে শীর্ষস্থানীয় বিদেশি মেধাবীদের নিয়োগের জন্য এইচ-১বি কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতির অংশ হিসেবে এইচ-১বি ভিসা ব্যবস্থায় আরও কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এমন একটি নতুন বাছাই প্রক্রিয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে বেশি দক্ষতা ও উচ্চ বেতনের কর্মীরা অগ্রাধিকার পেতে পারেন।
ফি নিয়ে ব্যবসায়ী ও অঙ্গরাজ্যগুলোর মামলা
এইচ-১বি ভিসার নতুন ফি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী লবিং সংগঠন ইউএস চেম্বার অব কমার্স, ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্য এবং শ্রমিক ও নিয়োগকর্তাদের একটি জোট মামলা করেছে।
মামলাকারীদের দাবি, বিদেশি নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ সীমিত করার প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা থাকলেও সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে কংগ্রেসের অনুমোদিত এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচিকে পরিবর্তন বা কার্যত অকার্যকর করার সুযোগ নেই।
তাদের আরও দাবি, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্যে কোনো ফি, কর বা আর্থিক ব্যবস্থা আরোপ করতে পারে না।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য, প্রস্তাবিত ফি প্রচলিত অর্থে কোনো কর নয়। বিদেশি নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ সীমিত করার প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার আওতায় এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
কমেছে এইচ-১বি আবেদন
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসননীতির প্রভাব এইচ-১বি ভিসার নিবন্ধনেও দেখা গেছে। গত বছর প্রায় ৩ লাখ ৪৪ হাজার এইচ-১বি ভিসার জন্য নিয়োগকর্তারা নিবন্ধন করেন। ২০২৪ সালের তুলনায় এই সংখ্যা ২৫ শতাংশের বেশি কম। আর ২০২৩ সালে প্রায় ৭ লাখ ৯৪ হাজার নিবন্ধন হয়েছিল, অর্থাৎ গত বছরের সংখ্যা তার অর্ধেকেরও কম।
এদিকে চলতি আগস্টের শুরুতে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ পৃথক একটি বিধিমালায় এইচ-১বি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন এবং বিদেশে থাকা কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত ফি যোগ করেছে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন প্রস্তাব এইচ-১বি ভিসা ব্যবস্থায় বড় ধরনের আর্থিক পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে ভারতীয় দক্ষ কর্মীদের ওপর এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নতুন বিধিমালা চূড়ান্ত হওয়ার আগে এবং চলমান আইনি লড়াইয়ের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই ফি স্থায়ীভাবে কার্যকর হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
পাঠকের মন্তব্য