
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর বর্তমান কার্যক্রম ও পরিচালন পদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ব্যবসায়ী ও ল্যাবএইড গ্রুপের প্রতিনিধি সাকিফ শামীম। তিনি মনে করেন, সাধারণ ব্যবসায়ীদের সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখার পাশাপাশি এফবিসিসিআইকে আরও শক্তিশালী গবেষণা, প্রশিক্ষণ, নীতিনির্ধারণ ও সেবা সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে সংগঠনটিতে তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
সাকিফ শামীমের মতে, দেশের ব্যবসায়ীদের অনেক সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান থাকলেও এসব সমস্যা সমাধানে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সাধারণ ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশিত যোগাযোগ তৈরি হয়নি। ব্যবসায়ীদের কাছে গিয়ে তাদের সমস্যা শোনা এবং সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার মতো নেতৃত্ব প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, এফবিসিসিআই দেশের ব্যবসায়ী সমাজের অ্যাপেক্স বডি হলেও সংগঠনটির মূল দায়িত্ব ও কার্যক্রম থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছে। জেলা চেম্বার ও বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে এফবিসিসিআইর কার্যকর যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, বিটুবি ম্যাচমেকিং ও ক্যাপাসিটি বিল্ডিংয়ের মতো কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে।
সাকিফ শামীম আরও বলেন, এফবিসিসিআইর নিজস্ব বিজনেস পুল, পর্যাপ্ত গবেষণা সক্ষমতা ও নিজস্ব ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নেই। প্রতিবেশী ভারতের এফআইসিসিআইর মতো শক্তিশালী গবেষণা ও থিংকট্যাংক সক্ষমতা তৈরি করা প্রয়োজন। তার মতে, ভবিষ্যতের ব্যবসায়ী সংগঠনকে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিচালনা করতে হবে।
ব্যবসায়ীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের দাবি
ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের একাধিক মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও সরকারি দপ্তরে অনুমোদন ও নিবন্ধনের জন্য যেতে হয় উল্লেখ করে সাকিফ শামীম বলেন, এতে ব্যবসায়ীদের সময় ও অর্থ দুটোই নষ্ট হয়। একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন ও নথিপত্র এক জায়গা থেকে পাওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে ব্যবসার পরিবেশ অনেক সহজ হবে।
তিনি বলেন, একজন ব্যবসায়ী যাতে পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় সব নথি ও অনুমোদনের কাজ সম্পন্ন করতে পারেন, সে ধরনের ওয়ান-স্টপ পোর্টাল তৈরি করা প্রয়োজন। এতে ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার সময় কমবে এবং প্রশাসনিক জটিলতাও অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।
বিনিয়োগে সংকট, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সাকিফ শামীম বলেন, ব্যাংকিং খাতে সংকট, ডলার সংকট, উচ্চ সুদের হার ও বর্তমান মুদ্রানীতির কারণে বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসার পরিবেশ আগের তুলনায় কঠিন হয়েছে। পুরো পরিস্থিতিকে তিনি ‘টার্বুলেন্স সিচুয়েশন’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তার মতে, অর্থনীতির বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে উঠতে শুধু স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে কিছু জরুরি পদক্ষেপও নিতে হবে। বিশেষ করে ব্যবসার জন্য ওয়ান-স্টপ পোর্টাল চালু এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক শিল্পকারখানা প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এর ফলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়েছেন। অর্থনীতির গতি ফিরিয়ে আনতে বন্ধ ও সংকটে থাকা কারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
কর্মসংস্থান বাড়াতে বন্ধ কারখানা চালুর তাগিদ
সাকিফ শামীম বলেন, অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের কোনো বিকল্প নেই। তাই বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো চালু করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। প্রয়োজনে রিফাইন্যান্সিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সংকটে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি যারা সম্প্রসারণ বা প্রবৃদ্ধির পর্যায়ে রয়েছে, তাদেরও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আগে সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দেশের বেসরকারি খাতের সেতুবন্ধ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বিদেশি বিনিয়োগে জ্বালানির নিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ
বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তাকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখছেন সাকিফ শামীম। তার মতে, দেশে চীনের বড় বিনিয়োগ রয়েছে এবং আরও বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনা চলছে। এসব বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি মনে করেন, একটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে সরকার, স্থানীয় ব্যবসায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
চার দশকে বিস্তৃত ল্যাবএইডের কার্যক্রম
স্বাস্থ্যসেবা খাতে ল্যাবএইডের অগ্রযাত্রা প্রসঙ্গে সাকিফ শামীম জানান, ১৯৮৪ সালে তার বাবা ডা. এম এ শামীমের হাত ধরে ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিকের যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৯৮৯ সালে গ্রুপ হিসেবে কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সেন্টার যুক্ত হওয়ার পর ২০০০ সালে ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল এবং ২০০৬ সালে ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হয়।
পরবর্তীতে ক্যানসার হাসপাতাল, ল্যাবএইড ফার্মাসিউটিক্যালস ও স্টেট ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গ্রুপটির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়। প্রায় চার দশকে ল্যাবএইড গ্রুপ ১৫ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে বলেও জানান তিনি।
স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি ফিনান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন, ইন্স্যুরেন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রিয়েল এস্টেট, এগ্রো ফার্ম এবং নেক্সট জেনারেশন সিকোয়েন্সিংয়ের মতো বিভিন্ন খাতেও কাজ করছে ল্যাবএইড।
স্বাস্থ্যসেবায় আস্থার সংকটের কারণ
দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে রোগীদের আস্থার সংকটের পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও দুর্বল স্বাস্থ্যবীমাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সাকিফ শামীম। তার মতে, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর সর্বোচ্চ প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ বীমা সুবিধার আওতায় রয়েছেন। এর বড় অংশই করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মী।
মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় অনেক রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সময়মতো শুরু করতে পারছেন না বলেও তিনি জানান। আর্থিক সামর্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ঢাকার বাইরে থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন শহরে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন সাকিফ শামীম। তার মতে, চিকিৎসাসেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
স্বাস্থ্যবীমায় আস্থা ফেরাতে দ্রুত দাবি নিষ্পত্তির পরামর্শ
দেশে স্বাস্থ্যবীমার বিস্তার বাড়াতে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে মনে করেন সাকিফ শামীম। তিনি বলেন, বীমার দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে তিনি সাত দিনের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করার কথা উল্লেখ করেন।
তার মতে, দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক মানুষ বীমার প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন। দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে ক্লেইম নিষ্পত্তি করা গেলে বীমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়ানো সম্ভব।
আগামী ১০ বছরে চিকিৎসায় বিদেশমুখিতা বন্ধের প্রত্যাশা
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আগামী ১০ বছরে কোথায় দেখতে চান—এমন প্রশ্নের জবাবে সাকিফ শামীম বলেন, তার অন্যতম বড় প্রত্যাশা হলো বাংলাদেশের মানুষ যেন উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে বাধ্য না হন।
তার মতে, দেশে চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। তবে শুধু হাসপাতাল বা অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না; চিকিৎসার মান, সেবার মান, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল—সবকিছুর সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে রোগীদের আস্থা অর্জন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, দেশের মানুষকে দেশীয় চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখতে হবে এবং হাসপাতালগুলোকে সেই আস্থা অর্জন করতে হবে। স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থার উন্নয়নও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব
স্বাস্থ্যসেবা খাতকে আরও শক্তিশালী করতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন সাকিফ শামীম। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
তার মতে, সরকারি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বেসরকারি খাতের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার মূল্য কাঠামোয় পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক হলেও যেখানে ঘাটতি রয়েছে, সেখানে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে।
ল্যাবএইড ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে মানুষের পাশে থাকার কথাও জানান তিনি। তার বিশ্বাস, সরকার, বেসরকারি খাত ও সাধারণ মানুষ—এই তিন পক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সব মিলিয়ে, এফবিসিসিআইকে আরও কার্যকর ও আধুনিক সংগঠনে রূপ দেওয়া, ব্যবসায়ীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সেবা নিশ্চিত করা, বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের আস্থা বাড়ানো—এসব বিষয়কে দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সাকিফ শামীম।
পাঠকের মন্তব্য