
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এখন টাকার সংকট নেই। বরং ব্যাংকগুলোর হাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ বাড়তে বাড়তে চার লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার কমিয়েছে, বিদেশি স্বল্পমেয়াদি ঋণের সুদসীমাও কমানো হয়েছে। এরপরও নতুন ঋণ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না দেশের উদ্যোক্তারা।
শুধু দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতাই কমেনি, বিদেশি উৎস থেকেও স্বল্পমেয়াদি ঋণের চাহিদা কমে এসেছে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি—ব্যাংকগুলোর হাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ রয়েছে, কিন্তু উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের জন্য সেই অর্থ নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত চাহিদা তৈরি হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। এর আগের মাস মে মাসে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি আরও কমেছে।
ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এ পরিস্থিতির পেছনে শুধু ঋণের সুদের হার দায়ী নয়। জ্বালানি সংকট, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা, রপ্তানি পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসা নিয়ে আস্থার সংকট উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগ থেকে দূরে রাখছে।
রেকর্ড নিচে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি
একসময় দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি খাতেও ব্যাংকঋণের চাহিদা বাড়ত। নতুন শিল্প স্থাপন, কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং কার্যকরী মূলধনের প্রয়োজন মেটাতে উদ্যোক্তারা ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করতেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্র বদলে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে। মে মাসে যা ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
ঋণের প্রবৃদ্ধি এতটা কমে যাওয়াকে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ সাধারণত বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়লে কার্যকরী মূলধন, যন্ত্রপাতি কেনা, কারখানা সম্প্রসারণ ও নতুন প্রকল্পের জন্য ব্যাংকঋণের চাহিদাও বাড়ে।
নীতি সুদহার কমিয়েও মিলছে না প্রত্যাশিত ফল
ব্যাংকঋণের ব্যয় কমিয়ে ঋণের চাহিদা বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৩০ জুলাই নীতি সুদহার বা রেপো হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করেছে। নতুন হার ২ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়েছে।
সাধারণত নীতি সুদহার কমলে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার খরচ কমে এবং এর প্রভাবে ঋণের সুদও কমার সুযোগ তৈরি হয়। এতে উদ্যোক্তাদের ঋণ নেওয়ার আগ্রহ বাড়ার কথা।
কিন্তু এবার এখন পর্যন্ত এর সুস্পষ্ট প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। ব্যাংকারদের মতে, সুদের হার কমানো ব্যবসার ব্যয় কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে একজন উদ্যোক্তা যদি নতুন বিনিয়োগে লাভের সম্ভাবনা না দেখেন, তাহলে শুধু সুদের হার কমিয়ে তাকে ঋণ নিতে উৎসাহিত করা কঠিন।
অর্থাৎ বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল সমস্যা ঋণের মূল্য নয়; বরং ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করার মতো অনুকূল ব্যবসায়িক পরিবেশের অভাব।
ব্যাংকের হাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি
বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ব্যাংকিং ব্যবস্থার তারল্য পরিস্থিতিতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। এক মাসের ব্যবধানে এই উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর হাতে ঋণ দেওয়ার মতো বিপুল অর্থ রয়েছে। কিন্তু উৎপাদনশীল খাতে সেই অর্থ ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত চাহিদা তৈরি হচ্ছে না।
উদ্বৃত্ত তারল্যের একটি বড় অংশ ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি বা এসডিএফে রাখছে। জুনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এ ব্যবস্থায় প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা জমা রেখেছে, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। বর্তমানে এসডিএফে অর্থ রাখার বিপরীতে ব্যাংকগুলো ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ সুদ পাচ্ছে।
ফলে ব্যাংকগুলোর সামনে এক ধরনের বিপরীতধর্মী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একদিকে তাদের হাতে বিপুল অর্থ জমা হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন ঋণের চাহিদা কমে যাচ্ছে। ফলে উৎপাদনশীল খাতে অর্থ বিনিয়োগের পরিবর্তে ব্যাংকগুলোর একটি অংশ অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেই রেখে দিচ্ছে।
ব্যাংকের ধার নেওয়ার প্রয়োজনও কমেছে
ব্যাংকগুলোর হাতে অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে যাওয়ায় কলমানি, আন্তব্যাংক রেপো এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপো থেকে ধার নেওয়ার প্রয়োজনও কমেছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে এই তিন উৎস থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট ধার ছিল প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। জুনে এ পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা।
এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর ধার নেওয়ার পরিমাণে বড় পতন হয়েছে। এর অর্থ হলো, স্বল্পমেয়াদে ব্যাংকগুলোর নগদ অর্থের চাপ কমেছে। ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা বিদ্যমান অর্থ দিয়েই নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে এলেও ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নতুন করে তারল্য জমছে।
ডলার কিনে বাজারে টাকা ছাড়ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক
ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য বাড়ার পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা কেনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বাজার থেকে নিট প্রায় ৬ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার কিনেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনে, তখন এর বিপরীতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় টাকা সরবরাহ করে।
ফলে ব্যাংকগুলোর হাতে টাকার পরিমাণ বাড়ে। কিন্তু অতিরিক্ত এই অর্থের সমপরিমাণ বিনিয়োগের চাহিদা তৈরি না হওয়ায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত তারল্য আরও বাড়ছে।
এখানেই বর্তমান অর্থনীতির বড় বৈপরীত্যটি স্পষ্ট হচ্ছে—ব্যাংকের হাতে টাকা বাড়ছে, কিন্তু সেই টাকা নতুন শিল্প, কারখানা কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণে যাচ্ছে না।
বিদেশি ঋণের চাহিদাও কমছে
শুধু দেশীয় ব্যাংকঋণ নয়, বিদেশি উৎস থেকেও অর্থায়নের চাহিদা কমে এসেছে।
ব্যবসায়ীরা সাধারণত মূলধনি যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল ও অন্যান্য আমদানি ব্যয় মেটাতে বিদেশি স্বল্পমেয়াদি ঋণ ব্যবহার করেন। সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট ও বায়ার্স ক্রেডিটসহ বিভিন্ন ধরনের বিদেশি ঋণ আমদানি ও উৎপাদন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের স্থিতি কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৫ কোটি ডলারে। গত এপ্রিলে এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৩ কোটি ডলার। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ছিল ১ হাজার ৪৭ কোটি ডলার।
অর্থাৎ নতুন বিদেশি ঋণ নেওয়ার তুলনায় পুরোনো ঋণ পরিশোধের প্রবণতা বেশি থাকায় মোট ঋণের স্থিতি বাড়ছে না।
কয়েক বছর আগেও চিত্র ছিল ভিন্ন
করোনার পরবর্তী সময়ে দেশের অর্থনীতিতে বিদেশি স্বল্পমেয়াদি ঋণের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছিল। ডলারের সংকট এবং আমদানি অর্থায়নের চাপ বাড়ার কারণে ব্যবসায়ীরা বিদেশি উৎস থেকে বেশি অর্থায়ন নিয়েছিলেন।
২০২১ সালে এ ধরনের ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৪৬ কোটি ডলারে। ২০২২ সালে তা আরও বেড়ে ১ হাজার ৬৪২ কোটি ডলারে পৌঁছায়।
পরবর্তী সময়ে ডলারের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে ব্যবসায়ীরা বিদেশি ঋণের ঝুঁকি কমাতে শুরু করেন। ২০২৩ সালের শেষে এ ঋণের স্থিতি কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৭৯ কোটি ডলারে। ২০২৪ সালের শেষে তা আরও কমে ১ হাজার ১৩ কোটি ডলারে নামে।
সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হলেও বিদেশি ঋণের চাহিদায় আগের গতি ফিরে আসেনি।
গত মার্চ পর্যন্ত দেশের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ১১ হাজার ৯৩ কোটি ডলার। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের স্থিতি গত ডিসেম্বরের ২ হাজার ৬ কোটি ডলার থেকে কমে ২ হাজার ২ কোটি ডলারে নেমেছে।
এ চিত্রও ইঙ্গিত করছে, শুধু দেশীয় ব্যাংক নয়, বিদেশি উৎসের অর্থায়নেও নতুন বিনিয়োগের চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
কমানো হয়েছে বিদেশি ঋণের সুদসীমা
ব্যবসায়ীদের বিদেশি স্বল্পমেয়াদি ঋণ গ্রহণে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক গত মে মাসে এ ধরনের ঋণের সর্বোচ্চ সুদহারের সীমা কমিয়েছে।
বর্তমানে সব ধরনের খরচসহ সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট বা এসওএফআরের সঙ্গে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ পর্যন্ত যোগ করে বিদেশি ঋণ নেওয়া যায়। আগে এসওএফআরের সঙ্গে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ পর্যন্ত যোগ করার সুযোগ ছিল।
অর্থাৎ বিদেশি ঋণের ব্যয় কমানোর জন্য নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর পরও বিদেশি ঋণের স্থিতি বাড়ছে না। এতে বোঝা যায়, ঋণের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিবেশও অনুকূল করা প্রয়োজন।
কেন ঋণ নিতে চাইছেন না উদ্যোক্তারা?
ব্যবসায়ীদের মতে, ঋণের সুদ কমানো হলেও সেটি একা নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
একজন উদ্যোক্তা নতুন কারখানা স্থাপনের আগে হিসাব করেন—নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে কি না, উৎপাদিত পণ্যের বাজার থাকবে কি না, উৎপাদন ব্যয় কত হবে এবং বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা।
সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। কোথাও উৎপাদন কমেছে, আবার কোথাও কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়েছে, যার ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।
এ অবস্থায় নতুন কারখানা স্থাপন বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে অনেক উদ্যোক্তা বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন জরুরি
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদের মতে, সরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি প্রায় ২৬ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতে তা ৫ শতাংশের কাছাকাছি। বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এটি বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। করপোরেট বন্ড, সুকুক এবং নন-ব্যাংক অর্থায়নের বাজার সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন তিনি।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, বিদেশি ঋণের সুদ কম হলেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিশ্চিত থাকলে, উৎপাদন ব্যয় বাড়লে এবং বাজারে চাহিদা দুর্বল থাকলে নতুন ঋণ নিয়ে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে উদ্যোক্তারা আগ্রহী হবেন না।
অর্থনীতিতে তৈরি হচ্ছে ‘বিনিয়োগ আস্থার সংকট’
অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে যাওয়া এবং একই সময়ে বিদেশি ঋণের স্থিতি কমে যাওয়া অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
সাধারণত বিনিয়োগ বাড়লে দেশীয় ব্যাংকঋণ ও বিদেশি অর্থায়ন—দুই ক্ষেত্রেই চাহিদা বাড়ে। উদ্যোক্তারা দেশীয় ব্যাংক থেকে কার্যকরী মূলধন নেন এবং বিদেশি উৎস থেকে মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির অর্থায়ন করেন।
এখন দুই ক্ষেত্রেই ধীরগতি দেখা যাওয়ার অর্থ হলো, বিনিয়োগের সামগ্রিক চাহিদাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু অর্থের জোগান বাড়িয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন নীতিগত স্থিতিশীলতা, ব্যবসার ব্যয় কমানো, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, উন্নত অবকাঠামো, আইনশৃঙ্খলার স্থিতিশীলতা এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ।
ঋণের সংকট নয়, এখন মূল সমস্যা বিনিয়োগের সংকট
সব মিলিয়ে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু ঋণের সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ব্যাংকগুলোর হাতে বিপুল উদ্বৃত্ত অর্থ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার কমিয়েছে। বিদেশি স্বল্পমেয়াদি ঋণের সুদসীমাও কমানো হয়েছে। তারপরও বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়ছে না।
এ পরিস্থিতি থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—দেশের অর্থনীতিতে এখন শুধু অর্থের অভাব নেই, বরং বিনিয়োগের সুযোগ ও ব্যবসায়িক আস্থার সংকটও রয়েছে।
উদ্যোক্তারা যদি নিশ্চিত হন যে নতুন বিনিয়োগের পর নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকবে, নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে এবং দেশি-বিদেশি বাজারে পণ্যের চাহিদা থাকবে, তাহলে ব্যাংকঋণ ও বিদেশি অর্থায়ন—দুই ক্ষেত্রেই চাহিদা বাড়তে পারে।
অন্যথায় ব্যাংকের হাতে টাকা বাড়তেই থাকবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে উদ্বৃত্ত অর্থ জমা হতে থাকবে, কিন্তু সেই অর্থ উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও নতুন শিল্প গড়ে তোলার কাজে পর্যাপ্তভাবে ব্যবহার হবে না।
তাই অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে শুধু সুদের হার কমানো বা ব্যাংকের তারল্য বাড়ানোর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যবসার ব্যয় কমানো, নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বাজার সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস তৈরি করাই এখন বেশি জরুরি।
অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—ব্যাংকের হাতে যখন চার লাখ কোটি টাকার বেশি উদ্বৃত্ত অর্থ রয়েছে, নীতি সুদহারও কমছে, তখন উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগের জন্য ঋণ নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না কেন? এর উত্তর খুঁজতে হলে শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ ও ব্যবসায়িক আস্থার দিকেও নজর দিতে হবে।
পাঠকের মন্তব্য