
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে দেশের অর্থনীতি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও কৃষি খাতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বরং এসব খাতের সংকট আরও তীব্র হয়েছে বলে দাবি দলটির। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং কৃষি উপকরণের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পড়ছে বলে জানিয়েছে দলটি।
সরকারের প্রথম ছয় মাসের সামগ্রিক কার্যক্রম মূল্যায়ন করে এনসিপি বিএনপি সরকারকে ‘সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ’ বলে মন্তব্য করেছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে দলটির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রমের লিখিত পর্যালোচনা তুলে ধরেন।
অর্থনীতি ও জ্বালানি সংকট নিয়ে এনসিপির অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারের ছয় মাসে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে অর্থনীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষায়, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে সারা দেশের মানুষ ভুগছে এবং শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে সরকার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এনসিপির মূল্যায়ন অনুযায়ী, অর্থনীতি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও কৃষি খাতে সরকারের নীতিগত উদ্যোগ যথেষ্ট কার্যকর হয়নি। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ বাড়ছে এবং উৎপাদন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
‘১৮০ দিনে সরকার সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ’
নাহিদ ইসলাম বলেন, জনগণ, সংবাদপত্র, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কার্যক্রম মূল্যায়ন করেছে এনসিপি।
এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে সরকারকে ‘সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর দাবি, সরকারের অপরিকল্পনা, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাই এ ব্যর্থতার প্রধান কারণ।
তবে ছয় মাস সময় একটি সরকারের সামগ্রিক সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, ছয় মাস হয়তো যথাযথ সময় নয়। কিন্তু সরকার যদি নিজেদের সফলতার প্রচার না করে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করত, তাহলে তাদের দুঃখ প্রকাশ ও জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের অভিযোগ
সরকারের প্রথম ছয় মাসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে এনসিপি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বিভিন্ন সংস্থা বাতিল করে দুর্বল আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।
বিরোধী দল, সাংবাদিক এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর হামলা ও হয়রানি বেড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। এসব ঘটনার বিরুদ্ধে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন এনসিপির আহ্বায়ক।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা থাকলেও সরকারের সময়ে সেই কাঠামো যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে না।
দুদক, মানবাধিকার কমিশন ও ন্যায়পাল নিয়ে প্রশ্ন
রাষ্ট্রের জবাবদিহি ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও ন্যায়পালের মতো ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’-এর প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর অবস্থায় রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
এনসিপির আহ্বায়কের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন হয়নি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, গণহত্যার বিচার, আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।
এনসিপির অভিযোগ, গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সরকারের প্রথম ছয় মাসে তার বড় অংশই পূরণ হয়নি।
দলটির মতে, শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি ছিল।
সরকারের ৩১ দফা নিয়েও সমালোচনা
সরকারের বহুল প্রচারিত ৩১ দফার বিভিন্ন বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই ৩১ দফার একাধিক বিষয় পরিবর্তন করা হয়েছে এবং সরকার নিজেরাই এসব প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে।
এনসিপির দাবি, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে যে পরিকল্পনা ও সংস্কারের কথা বলেছিল, বাস্তবে সেগুলোর সঙ্গে বর্তমান কর্মকাণ্ডের যথেষ্ট মিল পাওয়া যাচ্ছে না।
মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন নিয়েও কটাক্ষ
সরকারের মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার আগে জানিয়েছিল তাদের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু এখন উপদেষ্টাদের কাছ থেকে পরিকল্পনা চাওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী পরিবর্তন করা হচ্ছে।
এ সময় রাজনৈতিক কটাক্ষ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এভাবে পরিবর্তন চলতে থাকলে ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দেবে কি না।
আরও ছয় মাস পর দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না
সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড নিয়েও সতর্ক করেন এনসিপির আহ্বায়ক।
তিনি বলেন, আরও ছয় মাস পর সরকার বর্তমান সমস্যাগুলোর দায় অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা আগের সরকারের ওপর চাপানোর সুযোগ পাবে না।
তাঁর মতে, সরকারের মেয়াদ যত বাড়বে, দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও জনজীবনের পরিস্থিতির দায়ও তত বেশি বর্তমান সরকারের ওপর বর্তাবে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ভবিষ্যতে জনগণের কাছে পুরোনো সরকারের দায় তুলে ধরে বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য হবে না।
বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট নিয়ে সরাসরি আক্রমণ
সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটকে সরকারের অন্যতম বড় ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, দেশের মানুষ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটে ভুগছে। এর প্রভাব পড়ছে শিল্পকারখানায়। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন চালাতে সমস্যায় পড়ছে এবং কোথাও কোথাও উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
এনসিপির মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়াতে হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু সরকারের প্রথম ছয় মাসে এই ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যায়নি।
কৃষি খাতেও সংকটের অভিযোগ
অর্থনীতি ও জ্বালানির পাশাপাশি কৃষি খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এনসিপি। দলটির দাবি, কৃষি উপকরণের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি কৃষকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ওপরও চাপ তৈরি করছে।
কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সার, বীজ, সেচ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণের সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করে দলটি।
বিরোধী দলের মূল্যায়নে সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ
এনসিপির এই মূল্যায়ন মূলত বিরোধী দলের রাজনৈতিক অবস্থান ও সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ডের সমালোচনামূলক পর্যালোচনা। দলটির অভিযোগগুলোর মধ্যে অর্থনীতি, জ্বালানি, কৃষি, প্রশাসন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা—সবগুলোই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে এনসিপির সব অভিযোগের বিষয়ে আলাদা প্রতিক্রিয়া সংবাদ সম্মেলনে পাওয়া যায়নি।
এনসিপির নেতাদের মতে, সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অর্থনীতি ও জনজীবনে স্বস্তি ফেরানো, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট কমানো, শিল্প উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা, কৃষি খাতকে সহায়তা করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
সরকারের মেয়াদ আরও বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশাও বাড়বে। ফলে আগামী ছয় মাসে সরকারের কার্যক্রমই নির্ধারণ করবে প্রথম ১৮০ দিনের সমালোচনাগুলো কতটা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল এবং সরকার শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি ও জনজীবনের সংকট মোকাবিলায় কতটা সফল হতে পারে।
পাঠকের মন্তব্য