
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বিশ্বব্যাংকের প্রতিশ্রুত প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প ঋণের মধ্যে ৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ জুন পর্যন্ত ছাড় হয়নি। প্রকল্পের ধারণা গ্রহণ, মূল্যায়ন, অনুমোদন, অর্থায়ন চুক্তি সই এবং প্রথম কিস্তির অর্থ ছাড়—প্রতিটি ধাপেই দীর্ঘসূত্রতার কারণে এই অর্থ আটকে রয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একটি প্রকল্পের পর্ষদ অনুমোদন থেকে প্রথম কিস্তির অর্থ ছাড় পর্যন্ত গড়ে প্রায় ১১ দশমিক ৮ মাস সময় লেগে যায়। এর ফলে বিশ্বব্যাংকের ঋণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত রেয়াতকালের একটি বড় অংশই প্রকল্প শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
সাধারণত বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে তিন থেকে পাঁচ বছরের রেয়াতকাল দেওয়া হয়। কিন্তু অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের মধ্যেই প্রায় এক বছর চলে যাওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর সময় কমে যাচ্ছে। এতে প্রকল্প শেষ করতে বিলম্বের পাশাপাশি ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
অর্থ ছাড়ে প্রায় এক বছরের প্রক্রিয়া
ইআরডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের পর্ষদ প্রকল্প অনুমোদনের পর অর্থায়ন চুক্তি সই করতে গড়ে ৪ দশমিক ৪ মাস সময় লাগে। এরপর চুক্তি কার্যকর হতে আরও ২ দশমিক ১ মাস এবং প্রথম কিস্তির অর্থ ছাড় পেতে অতিরিক্ত ৫ দশমিক ৩ মাস সময় চলে যায়।
সব মিলিয়ে এই তিন ধাপেই প্রায় ১১ দশমিক ৮ মাস সময় প্রয়োজন হচ্ছে। এর সঙ্গে প্রকল্পের ধারণা তৈরি, সম্ভাব্যতা যাচাই ও অনুমোদনের আগের ধাপগুলো যুক্ত হলে পুরো প্রক্রিয়াটি আরও দীর্ঘ হয়।
ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের বাস্তব কাজ শুরুর আগেই অর্থায়নের নির্ধারিত সময়ের উল্লেখযোগ্য অংশ পার হয়ে যায়। পরে বাস্তবায়নে কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা কারিগরি জটিলতা দেখা দিলে প্রকল্প শেষ করতে আরও সময় প্রয়োজন হয়।
৩৭ প্রকল্পের ১৫টিতে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশে বর্তমানে ৩৭টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বলে ইআরডির মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের পর্ষদে অনুমোদিত আরও চারটি প্রকল্প একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের কথা রয়েছে।
অর্থাৎ অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া যথাসময়ে শেষ না হওয়ায় বড় অঙ্কের বৈদেশিক অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষাই বড় সমস্যা
ইআরডির প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কথা বলা হয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রকল্পের নকশা তৈরি ও অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করার সময় দেখা যায়, অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল নেই। ফলে নকশা সংশোধন, নতুন করে কাজের পরিকল্পনা এবং অতিরিক্ত অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।
এর প্রভাব পড়ে প্রকল্পের সময় ও ব্যয়ের ওপর। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি), বিশ্বব্যাংকের প্রজেক্ট অ্যাপ্রাইজাল ডকুমেন্ট এবং অর্থায়ন চুক্তির মধ্যে তথ্যের অমিল থাকলেও জটিলতা আরও বাড়ে।
ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক বদল
প্রকল্প বাস্তবায়নে আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে এসেছে।
একজন প্রকল্প পরিচালক দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে না পারলে প্রকল্পের কাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। নতুন পরিচালক দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পের নথি, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক বিষয়গুলো বুঝে নিতে আবারও সময় চলে যায়।
এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিটে প্রয়োজনীয় জনবল সময়মতো নিয়োগ না দেওয়া, জমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা এবং দরপত্র আহ্বানে বিলম্বের কারণেও প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চিহ্নিত হলেও এর পেছনে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন কঠিন।
ঋণ আলোচনায়ও রয়েছে সমন্বয়ের ঘাটতি
ইআরডির মূল্যায়নে প্রকল্পের নথি প্রস্তুত ও ঋণ আলোচনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির বিষয়টিও উঠে এসেছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির সময় বিশ্বব্যাংকের কারিগরি দল এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার মধ্যে যথেষ্ট সমন্বয় না থাকায় অসম্পূর্ণ নথি তৈরি হচ্ছে। পরে এসব নথির ওপর ভিত্তি করেই দ্রুত ঋণ আলোচনায় যাওয়া হচ্ছে।
কখনো কখনো প্রয়োজনীয় লিখিত নথি ছাড়াই মৌখিক তথ্যের ভিত্তিতে ঋণ আলোচনা ও কার্যবিবরণী সই করার ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘ডিজিটাল সিস্টেমস ফর ট্রান্সপারেন্সি, অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ প্রকল্প এবং মেট্রো রেল লাইন-২ প্রকল্পের ক্ষেত্রে এ ধরনের সমস্যার উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।
এক প্রকল্পে আটকে ১.৫৭ বিলিয়ন ডলার
প্রকল্প প্রস্তুতির কাজ সময়মতো শেষ না হওয়ায় চারটি প্রকল্পেই অন্তত ১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন আটকে আছে।
এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ডিজিটাল এন্টারপ্রেনারশিপ প্রজেক্ট, বে টার্মিনাল প্রজেক্ট, এনহ্যান্সিং ডিজিটাল গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ইকোনমি প্রজেক্ট এবং ওয়েস্টার্ন ইকোনমিক করিডোর অ্যান্ড রিজিওনাল এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প প্রস্তুতির কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
অনুমোদনের পরও এক থেকে দুই বছর বিলম্ব
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে অনুমোদিত ও চুক্তিবদ্ধ অনেক প্রকল্পও প্রশাসনিক ও নীতিগত জটিলতার কারণে দ্রুত কার্যকর হচ্ছে না।
‘বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্ট’ এবং ‘ইলেকট্রিসিটি ডিস্ট্রিবিউশন মডার্নাইজেশন প্রোগ্রাম’-সহ চারটি প্রকল্প কার্যকর হতে বিলম্বের কারণে অব্যবহৃত তহবিলের তালিকায় আরও প্রায় ১ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হয়েছে।
অর্থাৎ ঋণ অনুমোদন হলেও বাস্তবে প্রকল্পের কাজ শুরু করতে দীর্ঘ সময় লাগছে। এতে একদিকে দেশের উন্নয়ন প্রকল্পের গতি কমছে, অন্যদিকে বৈদেশিক অর্থায়নের সুবিধাও যথাসময়ে পাওয়া যাচ্ছে না।
‘অ্যাক্টিভ পোর্টফোলিও’ নিয়েও পার্থক্য
বিশ্বব্যাংক ও ইআরডির মধ্যে সক্রিয় প্রকল্প বা ‘অ্যাক্টিভ পোর্টফোলিও’ গণনার পদ্ধতিতেও পার্থক্য রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বোর্ডে অনুমোদিত প্রতিটি প্রকল্পকে সক্রিয় হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে ইআরডি অর্থায়ন চুক্তি সই হওয়া প্রকল্পগুলোকে সক্রিয় হিসেবে গণনা করে।
এ কারণে অর্থ ছাড় না হওয়া ঋণের পরিমাণ নিয়ে দুই পক্ষের তথ্যে পার্থক্য তৈরি হতে পারে। যেমন ‘বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্ট’ ও ‘এনার্জি সেক্টর সিকিউরিটি এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট’ বিশ্বব্যাংকের বোর্ডে অনুমোদিত হলেও এসব প্রকল্পের অর্থায়ন চুক্তি তখনও সই হয়নি।
‘বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্টে’ বিশ্বব্যাংকের ২৯০ মিলিয়ন ডলার এবং ‘এনার্জি সেক্টর সিকিউরিটি এনহান্সমেন্ট প্রজেক্টে’ ৩৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নের কথা রয়েছে।
মেয়াদ বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত অর্থায়নেও প্রশ্ন
প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো এবং অতিরিক্ত অর্থায়নের আবেদনেও সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে বলে ইআরডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘হেলথ সেক্টর সাপোর্ট প্রোগ্রাম’ ও ‘কোভিড-১৯ প্রজেক্ট’-এর মতো প্রকল্পে স্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া মেয়াদ বাড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে। আবার কিছু প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা না করেই অতিরিক্ত অর্থায়নের আবেদন করা হয়েছে।
এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার তাগিদ
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণগুলো বহু বছর ধরেই কমবেশি একই রকম। দুর্বল প্রকল্প প্রস্তুতি, জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, দরপত্র জটিলতা, ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব বারবার সামনে আসছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, প্রশাসনের যেসব দুর্বলতা প্রকল্পের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে, সেগুলো সরাসরি মোকাবিলা করা না হলে শুধু আশাবাদী বক্তব্য দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।
তার বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি কেন এসব সমস্যা বারবার ঘটছে এবং এর জন্য কারা দায়ী—সেটিও নির্ধারণ করতে হবে।
আটকে থাকা অর্থ দ্রুত কাজে লাগানোর প্রয়োজন
বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়নের গুরুত্ব অনেক। বিশ্বব্যাংকের মতো উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়া ঋণ অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহন, জ্বালানি ও ডিজিটাল খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে।
কিন্তু প্রতিশ্রুত অর্থ সময়মতো ছাড় না হলে সেই অর্থ দিয়ে যে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের কথা, তা পিছিয়ে যায়। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ে, ব্যয় বাড়ে এবং জনগণের প্রত্যাশিত সুবিধা পেতেও দীর্ঘ সময় লাগে।
তাই বিশ্বব্যাংকের প্রতিশ্রুত প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে আটকে থাকা ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ দ্রুত কাজে লাগাতে হলে শুধু ঋণ অনুমোদন নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। প্রকল্প প্রস্তুতি, নকশা, জমি অধিগ্রহণ, দরপত্র, জনবল নিয়োগ, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং অর্থায়ন চুক্তির প্রতিটি ধাপকে আরও কার্যকর ও সময়সীমাবদ্ধ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা গেলে একই অর্থ দিয়ে আরও বেশি উন্নয়ন কাজ করা সম্ভব হবে। অন্যথায় বিপুল বৈদেশিক অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তব উন্নয়নের সুফল পেতে বাংলাদেশকে আরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।
পাঠকের মন্তব্য