![]()
আহমেদ তোফায়েল
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর দায়িত্ব পালনে এক ‘অসম্ভব চাপ’ অনুভব করার কথা প্রকাশ করেছেন। একজন রাষ্ট্রনেতার এই অকপট স্বীকারোক্তি কেবল একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়। এটি বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার একটি গভীর প্রতিফলন।
দীর্ঘ সময় পর দেশে একটি নতুন রাজনৈতিক হাওয়া বইছে। সাধারণ মানুষের চোখে-মুখে যে খুশির ঝিলিক প্রধানমন্ত্রী দেখছেন, তা মূলত একটি গভীর মুক্তির আনন্দ। কিন্তু এই আনন্দের সমান্তরালে রয়েছে এক বিশাল প্রত্যাশার পাহাড়।
বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক সংকট, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং সুশাসনের অভাব মানুষকে একটি দ্রুত পরিবর্তনের দিকে ধাবিত করছে। সাধারণ নাগরিক চান তাদের দীর্ঘদিনের সমস্যার অবসান হোক রাতারাতি। কিন্তু রাষ্ট্রের সম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সীমিত। এই যে মানুষের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা এবং রাষ্ট্রের সীমিত সক্ষমতার মধ্যকার দূরত্ব, এটাই মূলত প্রধানমন্ত্রীর ওপর এই বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি করছে।
২৪ ঘণ্টা কেন পর্যাপ্ত নয়:
প্রধানমন্ত্রী তাঁর পিতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একটি প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন, দিনটি যদি ৪৮ ঘণ্টা হতো তবে ভালো হতো। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি আসলে সময়ের এক চরম সংকটের কথা তুলে ধরেছেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন একজন রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে ২৪ ঘণ্টা সময় কম মনে হচ্ছে? এর মূল কারণ রাষ্ট্রযন্ত্রের কাঠামোগত দুর্বলতা।
ছোট-বড় প্রায় সব ফাইলের অনুমোদনের জন্য —— দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। বিকেন্দ্রীকরণের অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে ফাইলের জট তৈরি হয়। ফলে প্রতিদিনের নির্ধারিত সময়ে সব কাজ সম্পন্ন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী যখন একটি নতুন গতিতে দেশ চালাতে চান, তখন এই পুরনো ও মন্থর গতিসম্পন্ন রাষ্ট্রযন্ত্র তাঁর কাজের গতিকে শ্লথ করে দেয়। ফলে অফিসের টেবিল থেকে কাজের ফাইল শেষ হতে হতে কখন সন্ধ্যা নেমে আসে তা টের পাওয়া যায় না। এটি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় কাঠামোগত সংস্কার কতটা জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রতিশোধহীনতার রাজনীতি:
প্রধানমন্ত্রীর জীবনের সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষার দিকটি উঠে এসেছে। তিনি নিজে দীর্ঘ সময় কারাবরণ করেছেন, শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁর পিঠের বাঁকা হাড় এখনো সেই নির্যাতনের নির্মম সাক্ষ্য বহন করছে। কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করে তিনি প্রতিশোধের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিরল এবং ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। কেন তিনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন?
কারণ তিনি জানেন, প্রতিশোধের আগুন কেবল প্রতিশোধই জন্ম দেয়, তা কখনো দেশের কল্যাণ বয়ে আনে না। যদি বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী সরকারের মতো একই রকম দমন-পীড়ন ও প্রতিশোধের রাজনীতি শুরু করে, তবে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চিরতরে নষ্ট হবে। এই ক্ষমার রাজনীতি দেশের ভেতর একটি সুস্থ, পরিচ্ছন্ন এবং অহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী—বিনিয়োগকারীরা দেশে বিনিয়োগ করতে নিরাপদ বোধ করবেন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হবে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা:
প্রধানমন্ত্রী সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, বর্তমান সরকার গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায়। তিনি সরকারের ভুলত্রুটি নিয়ে গঠনমূলক আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। এই অবস্থানটি অত্যন্ত কৌশলগত এবং দূরদর্শী। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যম হলো সরকারের আয়না। সরকার যখন বিশাল ক্ষমতার বলয়ে আবদ্ধ থাকে, তখন চারপাশে স্তাবক ও চাটুকারদের ভিড় বাড়ে। এর ফলে শাসকরা বাস্তব পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। গণমাধ্যম যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তবে সরকারের ভুলগুলো দ্রুত সামনে চলে আসে। এতে করে বড় কোনো বিপর্যয় ঘটার আগেই সরকার নিজেকে সংশোধন করে নেওয়ার সুযোগ পায়।
তাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা কেবল সাংবাদিকদের অধিকার নয়, বরং এটি সরকারের নিজের টিকে থাকার এবং সঠিক পথে চলার একটি বড় রক্ষাকবচ। গঠনমূলক সমালোচনা সরকারকে একনায়কতান্ত্রিক হয়ে ওঠা থেকে রক্ষা করে।
‘শুধু সরকার একা পারবে না’
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্য প্রকাশ পেয়েছে, তা হলো—একা কোনো সরকারের পক্ষে একটি রাষ্ট্রকে আমূল বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি সাংবাদিকদের তথা সুশীল সমাজের সহযোগিতা চেয়েছেন। একে আমরা ‘অংশীদারিত্বের শাসন’ বা Participatory Governance বলতে পারি। একটি রাষ্ট্র তখনই সফল হয় যখন রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের মধ্যে একটি সুদৃঢ় বন্ধন থাকে। সুশীল সমাজ এবং পেশাজীবীরা যদি কেবল দর্শকের ভূমিকা পালন করেন, তবে সরকারের পক্ষে তৃণমূলের আসল সমস্যাগুলো অনুধাবন করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী এই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে আসলে ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্যকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে চাচ্ছেন। তিনি চান প্রতিটি নাগরিক রাষ্ট্রের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অংশীদার হোক। এর ফলে সরকারের কাজের জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে এবং নীতিনির্ধারণ অনেক বেশি বাস্তবসম্মত হবে।
সংকটের ভেতরের চিত্র
প্রধানমন্ত্রী যে তীব্র প্রশাসনিক চাপ অনুভব করছেন, তার পেছনে রয়েছে আমলাতন্ত্রের সনাতন পদ্ধতি। ফাইল চালাচালির দীর্ঘসূত্রতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং দায়িত্ব এড়ানোর মানসিকতা আমাদের আমলাতন্ত্রের একটি বড় ব্যাধি। যখন একটি নতুন সরকার দ্রুত সংস্কারের এজেন্ডা নিয়ে কাজ শুরু করে, তখন আমলাতন্ত্রের এই ধীরগতি এক ধরনের অন্তর্ঘাত হিসেবে কাজ করে।
কেন এই স্থবিরতা? কারণ আমলারা অনেক সময় নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভিশন বুঝতে সময় নেন, অথবা তারা নিজেদের পুরোনো বলয় থেকে বের হতে চান না। এর প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা অবকাঠামো উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের প্রকল্পগুলো গতি হারায়। ফলে প্রধানমন্ত্রীর ওপর কাজের চাপ যেমন বাড়ে, তেমনি জনগণের মাঝেও অসন্তোষ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই সংকটের আশু সমাধান প্রয়োজন।
সুশাসনের চ্যালেঞ্জ:
বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গত কয়েক দশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এগুলোর নিরপেক্ষতা নষ্ট হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী যখন দায়িত্ব নিয়েছেন, তখন তাঁকে এই ভাঙা প্রতিষ্ঠানগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে পেতে হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং কঠিন কাজ। হুট করে আইন পরিবর্তন করলেই সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয় না, তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন। অতীতের এই ক্ষতগুলো নিরাময় করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণেই দুর্নীতি ও অনিয়ম সহজে দূর করা যাচ্ছে না, যা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর প্রশাসনিক চাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সাধারণ মানুষের মূল দাবি
জনগণের চোখের খুশির অন্তরালে একটি বড় শঙ্কা রয়েছে, তা হলো অর্থনৈতিক সংকট। বর্তমান বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দাম এবং কর্মসংস্থানের অভাব সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। সাধারণ মানুষ যখন প্রধানমন্ত্রীকে দেখে আশাবাদী হন, তখন তারা মূলত আশা করেন যে খুব দ্রুত বাজারের আগুন নিভবে, তরুণদের চাকরি হবে। এই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। যদি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন না আসে, তবে মানুষের এই খুশি ক্ষোভে পরিণত হতে সময় লাগবে না। প্রধানমন্ত্রী যে অসম্ভব চাপের কথা বলছেন, তার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার চ্যালেঞ্জ।
সমাধানের পথ:
এই জটিল প্রশাসনিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ থেকে উত্তরণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন। সমাধান হিসেবে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে:
সমস্ত ফাইলের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। স্ব-স্ব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের এবং সচিবদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে।
ই-গভর্নেন্স বা ডিজিটাল ফাইলিং ব্যবস্থার পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে ফাইলের গতিবিধি ট্র্যাক করা যাবে এবং আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমবে। ২৪ ঘণ্টার সময়কে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে প্রযুক্তির বিকল্প নেই।
আমলাদের কাজের মূল্যায়ন হতে হবে ফলাফলের ভিত্তিতে। যারা দ্রুত এবং স্বচ্ছতার সাথে কাজ করবেন, তাদের পুরস্কৃত করতে হবে।
প্রতিহিংসামুক্ত যে রাজনীতির কথা প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। এর সমাধানের জন্য:
প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং বুদ্ধিজীবীদের সাথে একটি জাতীয় সংলাপের ডাক দিতে পারেন। যেখানে দেশের মৌলিক ইস্যুগুলোতে (যেমন- অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও নির্বাচন ব্যবস্থা) একটি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা হবে।
গণমাধ্যমের গঠনমূলক সমালোচনাকে গ্রহণ করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি বিশেষ সেল গঠন করা যেতে পারে। এই সেল প্রতিদিন গণমাধ্যমে আসা যৌক্তিক সমালোচনা ও সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সরাসরি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেবে।
সরকারকে জনগণের সাথে সরাসরি ও নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে। রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা এবং সংস্কারের প্রকৃত সময়সীমা কত, তা জনগণকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে। স্পষ্ট যোগাযোগ মানুষের ধৈর্য বাড়াতে সাহায্য করবে এবং প্রধানমন্ত্রীর ওপর তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক চাপ লাঘব করবে।