![]()
ইবি রিপোর্ট
বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রত্যাশিত গতিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’-এ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩.৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। গত এপ্রিলে দেওয়া ৪.৬ শতাংশ পূর্বাভাস থেকে এটি ১.২ শতাংশ পয়েন্ট কম। একই সঙ্গে সরকারের ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার তুলনায়ও এটি অনেক নিচে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তানের পর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিই সর্বনিম্ন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে পুরো দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ২০২৭ সালে ৬.৭ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’।
বিশ্বব্যাংকের মতে, জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বেসরকারি ঋণের ধীরগতি এবং কঠিন রাজস্ব পরিস্থিতি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানোর প্রধান কারণ। পাশাপাশি দুর্বল বিনিয়োগ, ব্যবসার বাড়তি ব্যয় ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও পরিস্থিতিকে চাপে রেখেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, অর্থনীতির স্থবিরতা দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা দুর্বলতার ফল। তার মতে, নতুন করে সংকট গভীর হওয়া ঠেকানোর পাশাপাশি বিদ্যমান সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে সমাধান করতে হবে। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুনও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে চাহিদা কমে যাওয়া এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বাড়ার কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির গতি কমতে পারে। এদিকে বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং ঋণের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩০ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে নেমেছে। ফলে টানা তৃতীয় বছরের মতো প্রবৃদ্ধি কমেছে।
অর্থনৈতিক মন্থরতা, শ্রমের চাহিদা কমে যাওয়া ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। দৈনিক ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমায় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ১০.১ শতাংশ হয়েছে। জাতীয় দারিদ্র্যের হারও ২০২৬ সালে বেড়ে ২২.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৬ শতাংশের মতো থাকতে পারে। একই সময়ে নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরির প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ছিল।
বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যাঁ পেম ব্যাংকিং, রাজস্ব ও জ্বালানি খাতে দ্রুত সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার সময়।’
জ্যাঁ পেম ব্যাংকিং খাতকে বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করে জানান, খেলাপি ঋণের অনুপাত ২০২৬ সালে ৩২.২ শতাংশে পৌঁছেছে। তিনি ব্যাংকের সম্পদমূল্য পর্যালোচনা, কার্যকর ব্যাংক পুনর্গঠন এবং মূলধন জোগানের পরামর্শ দেন।
সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির মতে, কার্যকরভাবে ফ্যামিলি কার্ড ব্যবহার করা গেলে প্রায় ১৫.৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে সুরক্ষা পেতে পারে। এর সঙ্গে লক্ষ্যভিত্তিক অনুদান, খাদ্য ও নগদ সহায়তা যুক্ত হলে আরও ২৮.৫ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে রাখা সম্ভব হতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ৬.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের বিপরীতে বাংলাদেশের ৩.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ অর্থনীতির চলমান চাপকেই তুলে ধরছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, ব্যাংকিং, রাজস্ব ও জ্বালানি খাতে দ্রুত সংস্কার এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করাই প্রবৃদ্ধির গতি ফেরানোর প্রধান শর্ত।
পাঠকের মন্তব্য